সন্ন্যাসী বলল, কী জানতে চাইছ?
বিজ্ঞানী বলল, এ আকাশ, মাটি, জল, বাতাস, গাছপালা, পশুপাখি মানুষের জীবনের রহস্য।
সন্ন্যাসী বলল, পূর্ণ সত্যকে জানা সম্ভব না। এত রাশি রাশি প্রমাণ, এত রাশি রাশি তথ্য কোথা থেকে পাবে? যাই জানবে তাই অসম্পূর্ণ হবে। কেন মিথ্যা চেষ্টা করছ। একটা পাতার, একটা বালুকণার সম্পূর্ণ সত্যকেই আজও জানতে পারেনি মানুষ। অণু পরমাণুতে দিশা হারিয়েছে।
বিজ্ঞানী হাসল। বলল, আমার জানা না হয় চিরকাল থেকে যাবে অসম্পূর্ণ, তবু চেষ্টা করে যাব সম্পূর্ণের কাছাকাছি যতটা যাওয়া যায় যাওয়ার। কিন্তু তুমি কী খুঁজছ?
সন্ন্যাসী আত্মতৃপ্তির হাসি হেসে বলল, তুমি খুঁজছ সম্পূর্ণ সত্যকে, আমি খুঁজছি পরম সত্যকে।
বিজ্ঞানী বলল, তা সেই পরমই যে পরম বুঝবে কী করে?
সন্ন্যাসী করুণার হাসি হাসল। বলল, তাঁর কৃপা হলেই সে জানা যায়। মেধা, বাক্য, যুক্তি দ্বারা জানা যায় না। পরমের কৃপাতেই পরম সত্যকে জানা যায়।
বিজ্ঞানী বলল, তা সে কৃপাই যে কৃপা, নাকি মনের আত্মসম্মোহন বুঝবে কী করে?
সন্ন্যাসী বিরক্ত হল। কিন্তু মুখে হাসির রেশ রেখে বলল, যে বোঝে সে বোঝে।
বিজ্ঞানী বলল, সে না হয় হল। কিন্তু একের বোঝা আরেককে বোঝাতে পারবে তো?
সন্ন্যাসী বলল, বিলক্ষণ।
বিজ্ঞানী বলল, চলো, ওইখানে মেলা সন্ন্যাসীর বাস। আরও কিছু বিধর্মীও আছে। রেলস্টেশান কিনা। ওদের বোঝাও দেখি।
সন্ন্যাসী আর বিজ্ঞানী তাদের মধ্যে এসে দাঁড়ালো। বিজ্ঞানী বলল, ওহে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধকবৃন্দেরা, দয়া করে একে একে জানাবেন আপনাদের অনুভূত পরমসত্যটি কী?
প্রথম সন্ন্যাসী বলল, নিরাকার নির্গুণ ব্রহ্ম। দ্বিতীয় জন বলল, উঁহু, সাকার সগুণ ব্রহ্ম। তৃতীয়জন বলল, মাধব। চতুর্থজন চোখ পাকিয়ে বলল, সব মিছে কথা, শিব। আরেকজন বলল, দুর্গা, আমি আমার সম্প্রদায়গত ভাবে হাজার বছর ধরে গুরু পরম্পরায় জানছি তিনি দুর্গা, এরা বলে কী! আরেকজন বলল, আল্লাহ। আরেকজন বলল, পিতা-পূত্র-পবিত্রআত্মা। আরেকজন বলল, শূন্য।
ব্যস। লেগে গেল কোন্দল। তখন প্রথমের উল্লিখিত সন্ন্যাসী একদিকে সরে এসে বিজ্ঞানীকে বলল, পরমহংস এইজন্যেই বলেছিলেন "যত মত তত পথ" সেই পুকুরঘাটের গল্প, সেই গিরগিটির গল্প.....সবই আসলে এক।
বিজ্ঞানী বলল, সে তো না হয় পরমহংস বুঝেছিলেন। কিন্তু তিনিই বা কাকে বোঝাতে পেরেছিলেন বলুন। আসলে বিদ্বেষহীন মানুষের কাছে সবই এক। ভালো মানুষের হাতে যা-ই দেবেন তাই ভালো। ধর্ম ভালো, রাজনীতি ভালো, বিজ্ঞান ভালো। কিন্তু যার মনে হিংসা দ্বেষ অহমিকায় টইটম্বুর তার মনে ও পরমহংসদেবের তত্ত্বের কী কাজ বলুন। দেখছেন না চারদিকে অবস্থা। পরমহংস বিদ্বেষহীন ছিলেন বলে যত মত তত পথের সত্য পরমহংসের সত্য। কিন্তু এই সত্য অন্যের সত্য হয় কী করে? মুখে যতই বলুক সব এক। আচরণই বলে দেয় সব এক হয়নি। তাই পরমহংসকে নিয়েও আজ সম্প্রদায়ের বেশি কিছু হল কই? আর কিছু স্কলারদের পাথেয় হয়ে রইলেন।
এতটা শুনে সন্ন্যাসী বলল, কিন্তু বিজ্ঞানেও কি বিরোধ নেই? সে জ্ঞানই কি সম্পূর্ণ?
বিজ্ঞানী বলল, সে জ্ঞান সম্পূর্ণ নয়। সেখানেও মতবিরোধ আছে। কিন্তু সেখানে মত, ব্যক্তিগত অনুভব শেষ কথা নয়। তাই আলোচনার, বিতর্কের সুযোগ আছে। কিন্তু আপনার জানা অবশেষে আপনার জানার প্রামাণ্যেই শেষ, তাই না আছে বিতর্কের জায়গা, না আছে আলোচনার জায়গা। পরমসত্য আপনার পরম অনুভবেই শেষ। সম্পূর্ণ জ্ঞান, সাযুজ্যগত জ্ঞান তথ্য, প্রমাণ, বিচারের উপর নির্ভর করে। সম্পূর্ণ হবে না জেনেও তার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করে। তার একটা ধাপও তার কাছে পরম পাওয়া। আপনার কাছে আলাদা করে কোনো স্তর নেই, সবটাই আপনার পরম অনুভবের উপর দাঁড়িয়ে। সেটা ব্যর্থ হলে সব ব্যর্থ। আমাদের তা নয়। কোনো চূড়ান্ত বা পরমের উপর দাঁড়িয়ে নেই আমরা। তাই আমাদের সত্যের তর তম আছে। আপনাদের নেই।
ওদিকে প্রায় হাতাহাতি শুরু হয় আরকি। কেউ বলছে মুক্তি জীবনের লক্ষ্য, কেউ বলছে কৃষ্ণভক্তি, কেউ বলছে ব্রহ্মলীন, কেউ বলছে স্বর্গ, কেউ বলছে বেহেস্ত, কেউ বলছে নির্বাণ, কেউ বলছে আত্মজ্ঞান। কেউ বলছে নিরামিষ, কেউ বলছে, আমিষ। কেউ বলছে, পুবদিকে মুখ করে, কেউ বলছে পশ্চিমে।
সন্ন্যাসী ভাবছে, এ সবই কি সত্যিই এক? নাকি বিদ্বেষহীন সরল মনের কাছেই এক কেবল। সে একত্ব তার মনের গুণে। তত্ত্বের গুণে কি? তবে এতদিন ধরে কোনোকিছুরই মীমাংসা হল না কেন? দিন দিন বিভাজন আর বিদ্বেষই শুধু বেড়ে যাচ্ছে।