তখন সালকিয়ায় থাকি। ওখানেই জন্ম, ক্লাস ফোর অবধি ওখানেই পড়াশোনা। ভাড়া বাড়ি। পরপর তিনটে ঘর। একটায় ঠাকুমা - ঠাকুর্দা। একটায় আমি মা ভাই বাবা। আরেকটায় জেঠু জেঠিমা দিদি বোন। ঘর এমন যে, একটা খাটেই ঘরের অর্ধেক ভরে যায়। সামনে টানা বারান্দা। তার এক কোণে রান্নাঘর। উনুনের রান্না। বিকেলের চা স্টোভে।
বাড়িতে তখন একটাই খবরের কাগজ আসত। আনন্দবাজার। প্রথমে জেঠু পড়তেন। কারণ জেঠু একটু বেলায় অফিস যেতেন। বাবা কাকভোরে। সালকিয়া থেকে কাঁচরাপাড়া অনেকটা রাস্তা। অফিসে ঢুকতে হত সাড়ে সাতটার মধ্যে। তাই বাবার সঙ্গে আমার প্রায় দেখাই হত না সকালে। জেঠু অফিসে চলে গেলে ঠাকুমা পড়তেন। গরমকালে নিজের ঘরে বসে, শীতকালে বারান্দায় এক ফালি রোদে পিঠ রেখে। স্নান করে আসা সদ্য ভেজা চুল রোদে শুকাতো। আমার মনে হত ঠাকুমা যেন অন্য জগতের মানুষ। কে জানত তার বুকের আধখানা বাংলাদেশে ফেলে আসা ভিটে মাটির ব্যথা আজীবন গনগনে আঁচে মানুষটাকে পুড়িয়েছে। আমার মনে হত ঠাকুমা কী সুখী।
তারপর সে কাগজ যেত বৌদের কাছে। মা আর বড়মার ঘরে। বাবা ফিরতেন সন্ধ্যেবেলা। চা আর মুড়ি নিয়ে বসতেন কাগজ পড়তে। আর আমি? আমার মনে আছে কাগজের উপর উঠে পড়ে কখনও কখনও আমিও পাঠক হতাম, ছবির দর্শক হতাম। কারণ পুরো কাগজটা নাগালে পেতাম না। আজকেও যখন কাগজের গন্ধটা নাকের কাছে এনে শুঁকি, আমার সেই ফেলে আসা বারান্দা, একফালি রোদ আর ঠাকুমার ভিজে কাঁচা পাকা চুলের ছবি মনে আসে। যেন ভিজে চুলে নারকেল তেলের গন্ধ পাই, খবরের কাগজের গন্ধ পাই। একটাই কাগজ দিনের শেষে মলিন হয়ে সিঁড়ির তলায় জমে থাকত। বিক্রি করা হত। দৈবাৎ নৌকা হয়ে ভাসত বা উড়োজাহাজ হয়ে উড়ত। আজ বাড়িতে এতগুলো কাগজ, এত ইপেপার। কিন্তু সেই ঝিরিঝিরি সুখটা কেন যেন নেই।