Skip to main content

 

ছেলেটার গায়ে সবুজ জামা। জামার বুকে দুটো উড়ন্ত বক। তার কালো গায়ের উপর অমন রং ফুটেছে কি না? তার মা, তার উল্টোদিকের চেয়ারে বসে, সালোয়ার কামিজের রং নীলে সবুজে মিশে। ছোটো ক্যাফে। বাইরে বৃষ্টি। ভেতরে এদিক ওদিক কয়েকজন মানুষ। মানুষ কি আজকাল বেশি চিন্তামগ্ন থাকে? হয় মোবাইলের স্ক্রিনে, নয় চিন্তার দোদুলদোলায়।

ছেলেটার বয়স দশ ছাড়ালো? না বোধহয়। তার মা তার জন্য অর্ডার করেছে পিৎজা আর কালো কোল্ডড্রিঙ্কস।

টেবিলে অর্ডার দিয়ে গেল। মা মুচকি হেসে বলল, হ্যাপি বার্থডে। লাভ ইউ বেটা।

বাচ্চাটা হাসল। পিৎজাতে ছেদ টানল। মায়ের হাতে এক টুকরো দিয়ে বলল, নাও।

মা ফিরিয়ে দিল। বলল, আমি শুধু চা নেব বাবু। আজ উপোস না?

মায়ের বারোমাস উপোস। মা আয়ার কাজ করে। আজও কাজ ছিল। ছিল কী গো, আছে। রাতে যাবে। নার্সিংহোমে। খোকা একা থাকবে। বাবা নেই, ঠাম্মি নেই, ঠাকুর্দা নেই। একা খায়। একা থালা ধোয়। গ্লাস ধোয়। মেঝে মোছে। রান্নার বাসন মা সকালে এসে মাজে। তার ঘুম থেকে উঠতে উঠতে মায়ের কাপড়কাচা, বাসন মাজা সব সারা।

আবার ক্যাফেতে আসি। মায়ের ফোন এসেছে। কথা বলতে বলতে মায়ের হাতে নাচছে মাথার ক্লিপ। বড় ক্লিপ। আচমকা হাত থেকে পড়ে গেল। মা এমনই, যেই ঝুঁকেছে নিতে, অমনি গায়ের সঙ্গে কোল্ডড্রিঙ্কস লেগে.....উফ!! পড়ে গেল? না। ছেলেটা ঝট করে ধরে নিয়েছে যে। তার চোখেমুখে কী উৎকন্ঠা। এমন দিন কটা আসে তার জীবনে? যদি উল্টে যেত সব? মা!!! বলে চেঁচিয়ে উঠল। লজ্জা পেল পরক্ষণেই। পাবে না? সবাই তাকালো যে। তার দিকে তার মায়ের দিকে। যেমন তাকায় ওরা, যেন চুরি করেছে সে আর তার মা। সবাই শাসায় মাকে। বাড়িওয়ালা, দোকানি, টোটোওয়ালা, কাজের ওখানে, পাড়ায়....কোথায় না! যে আংকেলের সঙ্গে সে আর তার মা দীঘায় বেড়াতে যায় বছরে দুবার কী একবার, সেও। সে তো মারেও। চুলের মুঠি ধরে খাটে দেওয়ালে ঠুকে দেয়। তার বাবাও নাকি দিত।

আবার ক্যাফেতে আসি। ছেলেটার খাওয়া শেষ। মা চা খেল? না তো। মা রাতে কী খাবে?

মা বলল, কাজের ওখানে কিছু খেয়ে নেব।

ভরা পেটে বাচ্চাটার লজ্জা লাগে। বমি পায়। কান্না পায়। চুরি করেছে মনে হয়। মা আগে আগে হেঁটে যায়। সে পেছনে পেছনে যায়। শহরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। বৃষ্টি থেমেছে। হাজার হাজার মানুষ। মা ওই যে। হাঁটছে। ভিড়ের মধ্যে। তাকে খাইয়ে। নিজে না খেয়ে। মা হারিয়ে যাবে? ওই আংকেলের সঙ্গে চলে যাবে? যেও না। আমার পিৎজা চাই না। যেও না। আমার নতুন জামা, মোবাইলের রিচার্জ, জুতো, খেলনা চাই না। তুমি যেও না।

মা ফিরে তাকালো। এখান থেকে চলে যেতে পারবি একা? আমি বাস ধরব? দেরি হবে না হলে।

খোকা বলল, যাও।

খোকা একা হাঁটছে। বাস মিলিয়ে গেছে ভিড়ে। ঢেকুর উঠছে। লজ্জা লাগছে। এই লজ্জাটা বড় হলে থাকবে না। লজ্জা যাও। কষ্ট যাও। মা এসো।

বন্ধ দরজা। খোকা ঢুকল। আলো জ্বাললো। দরজা বন্ধ করল।

আর কী হবে ওর গল্প শুনে। চলো ফিরে যাই। ও একা থাকার অভ্যাস করুক। অনেক দুঃখ অনেক অভাবকে সত্য বলে জানুক। ওর কথা ও একদিন নিজে বলবে। সেদিন শুনব না হয়। আজ আসি।