যুক্তিতে মানুষ ভ্রান্ত হয়, বিশ্বাসে মানুষ ঠকে। এই দুই দুর্ভাগ্য মানুষের ভাগ্যের পরতে পরতে জড়িয়ে। এমন মানুষ নেই যে বলতে পারবে না, এক সময় সে ভুল যুক্তির দঁকে আটকায়নি, কিম্বা ঠকে যায়নি। স্বীয় যুক্তির ভ্রান্তিটা মানুষ বেশিদিন মনে রাখে না, কিন্তু ঠকে যাওয়ার গল্পটা মনে রাখে। তাতে অন্যকে দায়ী করা যায় যে। কিন্তু নিজের ভ্রান্ত যুক্তির ফাঁদে নিজের নাস্তানাবুদ হওয়ার গল্প তো নিজের মূর্খামির গল্প, তাই সে গল্পে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্য নয়। কিন্তু দুই তো সত্য।
তবু এই কি শেষ কথা হতে পারে? অন্যের কাছে আর নিজের কাছে নিজে বারবার ঠকে যাওয়াই কি মানুষের একমাত্র পরিণতি হতে পারে? ছলনাই কি একমাত্র সত্য তবে?
মহাপুরুষ তিনি, যিনি আমার যুক্তিকে ভ্রান্তির হাত থেকে রক্ষা করেন, আমার বিশ্বাসের আবেগকে চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেন। আমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করেন। তিনি মহাপুরুষ, তিনিই আমার গুরু। তাঁর শিক্ষায় আপাত কঠোরতা আছে, কিন্তু ছল নেই। তার আবেগের ভাষায় আপাত রুক্ষতা আছে, রূঢ়তা আছে, কিন্তু ছল নেই। তাই দিনের শেষে আশ্রিত বুঝতে পারে, সে আঘাত পেয়েছে, কিন্তু ঠকে যায়নি। মানুষের যতগুলো অত্যন্ত যন্ত্রণাময় অনুভূতি আছে তার মধ্যে একটা হল ঠকে যাওয়ার অনুভূতি। অন্যের কাছে ঠকে যাওয়া অবসাদ, আর নিজের ভ্রান্ত যুক্তির দ্বারা ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার গ্লানি।
মহাপুরুষ মানে কি সেলিব্রিটি? একদম না। বরং সেলিব্রিটি মহাপুরুষেরাই আজকাল এক একটি ফাঁদ। তবে তাঁকে চিনব কী করে? প্রচণ্ড জ্বর ঘাম দিয়ে ছেড়ে যাওয়ার পর যেমন করে ওষুধের মাহাত্ম্য বুঝি, ঠিক তেমন করে। নিজের বিকারগুলোর শিকড় যখন দুর্বল হতে শুরু করে, আসক্তির সহস্র হাত যখন গুটিয়ে যেতে শুরু করে তখন বুঝি, ওষুধ কাজ করতে শুরু করেছে। অন্যকে নিয়ে ভয় তখন আর ত্রাস হয় না, যখন নিজেকে নিয়ে ভয় আর থাকে না।
লীলাপ্রসঙ্গে স্বামী সারদানন্দজী লিখছেন, ঠাকুর যে আমাদের কাছে কী ভরসার স্থল ছিলেন তা ভাষায় বোঝাতে পারিনে।
হয় তো ভাষায় বোঝাতে পারেননি, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আগত সেই যুবকবৃন্দ তাদের জীবন দিয়ে বুঝিয়ে গেছেন, না, তাঁরা ঠকেননি। না হলে অমন শিক্ষিত, কর্মঠ সব যুবকেরা, অত অল্প বয়সে ছেড়ে যাওয়া একজন প্রৌঢ়ের কারণে সর্বস্ব দিয়ে গোটা জীবন কাটিয়ে দেয় কী করে? কীসের সুবিধা ছিল? সামাজিক লাঞ্ছনা তো ছিলই, সঙ্গে দারিদ্র্য, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আত্মীয়স্বজনের অবুঝপানা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তাঁরা এটুকু জানতেন, প্রাণে প্রাণে জানতেন, তাঁরা ঠকে যাননি।
এখানে একটা রহস্য আছে। যে মানুষ খাঁটি জিনিস চায়, সে খাঁটি জিনিস পাবেই। শ্রীরামকৃষ্ণের ভাষায়, আন্তরিক হলেই হবে। একজন পুরী যেতে চায়। আন্তরিক যেতে চায়। কিন্তু রাস্তা চেনে না। কিন্তু নিজের ইচ্ছাটাকে চেনে। সে ইচ্ছা খাঁটি বলেই সে ইচ্ছার উপর ভর করে সে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু ভুল রাস্তায় চলতে শুরু করে। কিছু দূর গিয়ে একজনকে জিজ্ঞাসা করে, হ্যাঁ গো, পুরী কি এই দিকে? সে বলে, না হে, পুরী তো ওইদিকে, তুমি ভুল রাস্তায় এসে পড়েছ। সে তখন ঠিক রাস্তায় গিয়ে নিজের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছায়। “পথ আমারে সেই দেখাবে যে আমারে চায়, আমি অভয় মনে ছাড়ব তরী এই শুধু মোর দায় গো, এই শুধু মোর দায়”।
সেদিন একজন মহাপুরুষকে ঘিরে কয়েকজন তরুণ যে আন্দোলন তুলেছিল, আজ তা নেই। তাই হয়। একজন মহাপুরুষকে ঘিরে যে যুগে যে আন্দোলন ওঠে পরবর্তী যুগে তার একটা শীতল প্রথা ঘূর্ণী চলতে থাকে, দাগের পর দাগ বুলিয়ে যাওয়া। ক্রমশ অচলায়তন হয়ে ওঠে। সেদিনের আন্দোলনের ইতিহাস, সেদিনের বলে যাওয়া কথা হয় তো ক্ষণিকের জন্য আমাকে অনুপ্রাণিত করে যেতে পারে, কিন্তু গোটা জীবনকে এক সুতোয় গাঁথার জন্য তা যথেষ্ট নয়। মানুষ বই দিয়ে তৈরি নয়। মানুষ কৃত্রিম, প্রাতিষ্ঠানিক অনুশাসন দিয়ে তৈরি নয়। মানুষ তার প্রাণের গভীর ইচ্ছার প্রকাশ। সেটুকুই তার আসল। তাকে চাপা দিয়ে কোনো তোতাকাহিনী গড়ে ওঠে, কিন্তু বনের পাখির জন্য তা যথেষ্ট না। তাই প্রতিটা মানুষের অন্বেষণ তার ব্যক্তিগত অন্বেষণ। তার অন্বেষা যত খাঁটি তার পথ তত কঠিন। তবে পুরনো পথিকেরা বলে, ভয় নেই, পথিক খানিক ঘুমিয়ে পড়লেও কান্ডারি জেগে থাকে। দুঃখের আঘাতে মনে করিয়ে দেয়, রাস্তা এখনও অনেক বাকি। সেই দুঃখই একদিন তাকে ভব পারাপারের তীরে নিয়ে আসে। সে এসে দেখে একজন অতিপরিচিত জন মাঝি হয়ে তার অপেক্ষায় বসে আছে। সে বিহ্বল হয়ে বলে, তবে যে ওরা আমায় বলল, তুমি নেই, তুমি আসবে না? তুমি আমার এত পরিচিত এ কথা আগে জানাওনি কেন? আমি যাই, ওদের বলে আসি গিয়ে?
মাঝি হাসে। বলে ওরা সবাই আসবে, যার যখন সময় হবে, তুমি এসো।