ভারতীয় দর্শনে বলা হচ্ছে সমস্ত সৃষ্টির সারতত্ত্ব হছেন, ব্রহ্ম। ব্রহ্ম সগুণ আর নির্গুণ। নির্গুণ ব্রহ্ম নিরকার। তিনি ভাবনা চিন্তার অতীত। কিন্তু বোধের আনন্দের অতীত নন। যা অপ্রকাশিত তা তো অস্তিত্বহীন নয়। তাই বেদান্ত দর্শন বলল সেই অপ্রকাশিত অস্তিত্ব চিন্তার অতীত, ভাষার অতীত। এখানেই থেমে গেল সব কথা। গভীর ধ্যানে অনুমান হতে পারে। আভাস পাওয়া যেতে পারে। হয় তো বা লীন হওয়া যেতে পারে।
আর সগুণ ব্রহ্ম? তিনিই ঈশ্বর। তিনি আমার বোধের অনুভবের। তিন গুণের সমাহারে যা কিছু সৃষ্টি, সব তিনি। মায়াবাদ আর লীলাবাদের পার্থক্য এইখান থেকে শুরু হল। মায়াবাদ সেই অপ্রকাশিত অস্তিত্বকেই ধ্রুব বলে জানাতে চাইল। লীলাবাদ প্রকাশবান তিন গুণের সমাহারে সৃষ্ট জগতকে সত্য বলে জানালো। সত্ত্ব রজ তম তিনগুণের সমাহারে যা কিছু।
গুরু থেকে ইষ্টদেবতা সেই সগুণ ব্রহ্মের প্রকাশ। তিনি মায়াধীশ। তিনি মুক্ত। তিনি আনন্দময়। তিনি স্বার্থগন্ধ শূন্য। নানক যোগ করলেন, তিনি ভয়রহিত। তিনি নির্বৈর।
ভক্ত প্রশ্ন করল, ভক্তি করা যায়?
এখানে দুই ভক্তির কথা এলো। সগুণ ভক্তি, নির্গুণ ভক্তি। এখানে নির্গুণ শব্দে একটু ধোঁয়াশা আছে। নির্গুণ এখানে আসলে নিরকারে ভক্তি। সগুণ ব্রহ্মের আকারে ভক্তি সগুণ ভক্তি। যেমন তুলসীদাস, মহাপ্রভু, মীরা। সগুণ ব্রহ্মের নিরাকারে ভক্তি - নামে আর গুরুতে ঠাঁই। যেমন কবীর নানক। বাউল ডাকে। শাক্ত ডাকে। বৈষ্ণব ডাকে। খ্রীষ্টান ডাকে। মুসলমান ডাকে। আধুনিক বৌদ্ধ ডাকে। প্রাচীন বৌদ্ধ দুঃখকেই আর্যসত্য জেনে ত্রাণের রাস্তা খুঁজতে সগুণ ব্রহ্মের সৎ গুণাবলীর সাধন করে। যা অষ্টাঙ্গিক মার্গ নামে পরিচিত। এ জগত সে সগুণ ব্রহ্মকে ছেড়ে নয়। শিয়ালদহ স্টেশান। যার যেখানে যাওয়ার সে উঠছে। যেখানে নামার সে নামছে। কেউ কোথাও যাচ্ছে না, ফেরি করে বেড়াচ্ছে, ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছে। আবার ইয়ার্ডে কিছু ট্রেন রাখা আছে। যাই শান্তিপুর লোকাল, কল্যাণী লোকাল ইয়ার্ডে গিয়ে তার কোনো পরিচয় নেই। আবার শিয়ালদায় এসে কোনো একটা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালেই তার পরিচয়।
তবে নির্গুণ ব্রহ্ম কি সক্রিয় না নিষ্ক্রিয়? উত্তর কোনোটাই নন। সব মিলিয়ে সক্রিয়তায় এক নিষ্ক্রিয়তা লীন আবার নিষ্ক্রিয়তায় সক্রিয়তা লীন। এই লীন দুই অবস্থানকে মিলিয়ে যে রূপ তিনি পুরুষোত্তম। তিনি বাউল। তিনি আপাতভাবে ছন্নছাড়া হয়েও সব সৃষ্টির মূলে, মণিতে গাঁথা মালার সুতোর মত।
তাই প্রাচ্য দর্শনে জীবনের মানে কী প্রশ্নটা অবান্তর। জীবনের গতি কী প্রশ্নটার অর্থ আছে। জীবনের মানে কী মানে প্রশ্ন করা ঢেউয়ের মানে কী? সমুদ্রের মানের মধ্যে ঢেউয়ের মানে অন্তর্লীন। তেমনই এই ত্রিগুণের সমাহারে ত্রিগুণের অধীশ্বর যিনি তাঁর মানের মধ্যে আমার মানে অন্তর্লীন। “আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না, এই জানারই সঙ্গে সঙ্গে তোমায় চেনা”। “আধেক আসনে তারে ডেকে লয়ে নিজ মালা দিয়ে বরিলে”। জীবনের গতি কী? পুরুষোত্তমকে জানা। পুরুষোত্তম রঙে রাঙা হওয়া।
আজ হিন্দুধর্মকে কেবলমাত্র বৈষ্ণবধর্মের ঢঙেই দেখানোর ঢল এসেছে। শ্রীকৃষ্ণ সগুণ ব্রহ্মের প্রকাশ বটে। বৈষ্ণব সিদ্ধান্ত মতে তাই চূড়ান্ত প্রকাশ। কিন্তু সেটা সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা। কালী, সরস্বতী, শিব, গণেশ, খ্রীষ্ট ইত্যাদিও বেদান্তের মতে সেই সগুণ ব্রহ্মেরই প্রকাশ। যিনি মুক্ত, যিনি উদার, যিনি নির্বৈর, যিনি নির্ভয়।
সাপ হেললে দুললেও সাপ, চললেও সাপ। শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্তের এই অসাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যাকে নিজের জীবনে, বাণীতে যাপিত করে গেছেন। সত্যের আনন্দময় রূপ যা চৈতন্যময় হয় সব ধর্মের আরাধ্যতে। তাঁকে জানাই জীবনের পরম গতি। এই ব্যাখ্যা করে গেছেন। আমাদের এ যুগের কাজ হল কুয়াশা, দামামা, অন্তঃসার শূন্য ঢক্কনিনাদ, আপাত বিরোধের নানা স্বার্থবুদ্ধি প্রণোদিত ক্ষুদ্রতাকে দূরে রেখে এই সত্যকে আবার করে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা, শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবানুগ হয়ে। জয়গুরু।