ওইটুকু মেয়ে, সবজি নিয়ে বাজারে বসেছে সন্ধ্যায়। হয় তো মা কী বাবা বসিয়ে রেখে গেছে। বয়স হবে দশ কী এগারো। কালো ফ্রক পরনে। ময়লা সেটা। কিন্তু তার মুখটা? ওইটুকু বালবের স্বল্প আলোয় চকচক করছে। উজ্জল দুটো চোখ রাস্তার লোকেদের দেখছে।
বেশি সবজি নেই যদিও তার সামনে। বাজারে ভিড় থিকথিক করছে। এমন সময় এলো বৃষ্টি। শ্রাবণের আকাশ, সে কী আর বলে কয়ে আসবে। মেয়েটা হুড়মুড়িয়ে খেলনার গোছানোর মত করে সব সবজি কোলের কাছে টেনে বসল।
একজন খদ্দের এলো। মাঝবয়সী মহিলা একজন। উবু হয়ে বসল ছাতা মাথায় দিয়ে। তার ওড়না রাস্তায় লুটিয়ে ভিজছে। তার হুঁশ নেই। বসে বসে পটল বাছছে। বাচ্চাটা বলল, তোমার ওড়না জলে ভিজছে যে গো। খদ্দের তাড়াতাড়ি কোলের উপর ভিজে ওড়না গুটিয়ে বলল, এ বাবা, এ তো ভিজে চাপ রে। মেয়েটা তো হেসেই কুটিপাটি। হাতে দাড়িপাল্লা নিয়ে বলল, তুমি তাড়াতাড়ি করো, আমার প্লাস্টিকের ছাউনি তো ছোটো, একটু পরেই জল জমে হুস্ করে তোমার মাথায় গিয়ে পড়বে, স্নান করে যাবে। এই বলে সে প্রায় লুটিয়ে পড়ে হাসতে হাসতে। তার খদ্দের ভয় পেল। তাড়াতাড়ি কেনাকাটা সেরে চলে গেল। তার হুড়মুড় করে চলে যাওয়াটা মেয়েটা দেখে আর ফিকফিক করে হাসে। এমন সময় ঘন্টা বেজে উঠল, শাঁখ বেজে উঠল, উলুধ্বনি শুরু হল। সামনে মায়ের মন্দির। বাচ্চা মেয়েটা হাত জোড় করে নমো করল। যাকে ঘিরে এত আয়োজন মন্দিরে, সেই আরেক কালো মেয়ের হাসিমুখের উপর পঞ্চপ্রদীপের শিখা, আলোর খেলা খেলে বেড়াচ্ছে। আরেক মেয়ে খদ্দেরশূন্য দোকানে হাঁটু দুটো জড়ো করে তার উপর মাথাটা রেখে রাস্তার উপর বয়ে যাওয়া শ্রাবণের ধারা স্রোত দেখছে। ক্ষণজন্মা নদী। আরেক মেয়েও দেখছে মহাকালের স্রোত যুগযুগান্ত পার করে। কালো ফ্রক, শ্রাবণের কালো মেঘ আর ওই হাসিমাখা উজ্বল চারজোড়া চোখ, দুই আনন্দময় মুখের উপর.... কী যেন এক খেলা! সাক্ষী মহাকাল!