মানুষের শেষ কথা বলে কিছু হয় না। যতদিন মানুষ চেতনায় বেঁচে থাকে ততদিন তার কথা থাকে। কথা একটা বহমান সত্তা।
বাবা চলে গেলেন প্রায় একমাস হতে চলল। কী কথা বলে গেলেন? কিছুই না। কাঁচরাপাড়া রেলের হাসপাতাল থেকে কলকাতার BR SING হাসপাতাল, এম্বুলেন্সে বাবা শুধু তাকিয়েই থাকলেন প্রায় দু ঘন্টা আমার মুখের দিকে। কী বলতে চাইলেন? জানি না। জিজ্ঞাসা করাতে বললেন, কিছু না। মাঝে মাঝে চোখের কোল ভিজে এলো বাবার। আমি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত যানের কাঁচের বাইরে তাকালাম। এখন কি চোখে জল আনার সময়। এখন তো হাসি মুখে আশ্বাস জানানোর সময়, বারবার বলা, কই কিছু হয়নি তো, সব ঠিক আছে। আমার জন্মলগ্ন থেকে যে চোখের দৃষ্টির সাক্ষী আমার দৃষ্টি, তার নিভে যাওয়ার সময় এলো। গান শুনবে? কী গান শুনবে? জানো এই রাস্তাটা ওদিকে গেলেই দক্ষিণেশ্বর, জানো এইটা কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে, কী তাড়াতাড়ি যাওয়া যায় এখন......কান্নার দমক গিলে গিলে বলেই যাচ্ছি....কথা থামানো যায় না এই সময়। আমার অনেক কথা বলার আছে। কিন্ত থাক। যদি কোনোদিন আবার দেখা হয়, সব কথা বলা যাবে।
মা চলে গেলেন অসময়ে। এক বাড়িতে দুই পরিণত বয়স্ক পুরুষের জীবনে বড় ছেদ পড়ল। একজন জীবনসঙ্গী হারালেন অকালে, একজন জীবনের পরম আশ্রয় হারলো, মা। তারপর ধীরে ধীরে তিনি অসুস্থ হলেন। দীর্ঘদিন ঘরবন্দী থাকলেন। তখন সম্পর্কটা পিতা পুত্রের না। জীবনের যে ছন্দ ছিঁড়ে গেল সেই ছন্দকে কতটা স্বাভাবিক করা যায়? সেই এক চ্যালেঞ্জে এসে দাঁড়ানো গেল। দুই পুরুষের ভাবনায়, বিশ্বাসে যোজন যোজন ব্যবধান। কীভাবে সরবে? কীভাবে তৈরি হবে সেতু? কাছাকাছি তো আসতেই হবে। শরীরে খবর নিতে হবে। চিকিৎসার নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে। কী কঠিন কাজ। আমাদের সমাজে পুরুষের জন্য আলাদা করে ইগো/ অভিমান তৈরি করে দেয়। তাকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখতে বলে। দুই পুরুষের দুই বিশ্বাসের, দুই জীবনশৈলীর সেকি ব্যবধান। পার হব কী করে? শুরু হল এক নতুন অভিযান। দু পক্ষেরই চেষ্টা শুরু হল। বোঝাবুঝির চড়াই উতরাই পার হতে হতে মাস পেরোলো, বছর পেরোলো। বাইরের গোটা সংসার ভীষণ ব্যস্ততায় ছুটে চলেছে। এরই মধ্যে দুজন পুরুষ কী কঠিন লড়াইয়ে। এক অন্তহীন শূন্যতার মধ্যে কান পেতে শোনা, কোথাও কোনো পায়ে চলার পথ অন্তত বার করা যায় কি?
ব্যক্তিগত কথারা আড়ালেই থেকে গেল। রাজনীতি, খেলা, সঙ্গীত, সিনেমা, সমাজ, সাহিত্য ইত্যাদি ইত্যাদি কত বিষয় এলো কথায়। আগ্রহ? আগ্রহ পথের উপর নয়, গন্তব্যের উপর। যে করে হোক একটা সুতো তো বাঁধতেই হবে।
এমন সময় এলো মহামারি। অতিমারি। তার প্রবল ছোবলে আরেক বড় আঘাত অপেক্ষা করছিল নিশ্চয়ই। তিনি কনিষ্ঠ সন্তানহারা হলেন। আমি ভাতৃহারা। সেতু যা গড়ে ছিল, সে সেতুর আর দরকার হল না। জীবনের নদীতে যেটুকু জল বয়ে যাচ্ছিল, সেটুকুও শুকিয়ে গেল। শুষ্ক অববাহিকার দুই তীরে দুইজন বসে থাকলাম মাসের পর মাস, আরও কয়েক বছর। রক্তের মধ্যে অতীতের হেঁটে বেড়ানোর শব্দ। ওদিকেও কি তাই? বাবা? শুষ্ক দুটো চোখে, গভীর শূন্যতা। যেন যুগ যুগ ধরে উড়ে বেড়াচ্ছে গোটা আকাশ জুড়ে একটাই চিল। তার ডানার আঘাতজাগা শব্দ ভাঙা পাঁজরে খুঁজে বেড়াচ্ছে আশ্রয়।
শোক দীর্ঘজীবী হলে মৌনতা পায়। তাই হল। মৌনতা শাখাপ্রশাখা মেলে স্মৃতির অনুরণনে। এবার কথা শুরু হল কেবল অতীতকে ঘিরে। বাবার ঘর জুড়ে শুধু অতীতের মজলিস। গোটা সংসার যখন সামনের দিকে দৌড়াচ্ছে বড় বড় পা ফেলে, তখন দুজন পুরুষ গুটি গুটি পায়ে অতীতের জমানো সময়ে স্নান করতে এসেছে। আসছে রোজ। এ জল শীতল। এ জল পানীয় নয়। এ জল জীবন নয়। কিন্তু এই জলটুকুই অবশিষ্ট যে। এ মরীচিকা নয়। কিন্তু এ মরুদ্যানও নয়। এ মোহ। জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে কখনও কখনও এ মোহের বেড়াজাল ঘিরতে হয়। তাই হল। আমার জীবন ভাগ হল দুই অধ্যায়ে। এক, বর্তমানে। দুই অতীতে। মাঝে মাঝে গুলিয়ে যেতে লাগত, কোনোটা বেশি সত্য, কোনোটায় বেশি আমি।
একদিন সকালে BR SING হাসপাতাল থেকে ফোন এলো, আপনার বাবার কার্ডিয়াক আরেস্ট হয়েছে।
শনিবার সকাল ছিল সেটা। আগের দিন বিকেলে গিয়েছিলাম দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে। ভবতারিণীর কাছে। বাবার প্রবল আস্থার স্থল। মায়ের শ্রীচরণ। তার ফুল নিয়ে যাব। ITU তে নার্সের হাতে দিয়ে বলব, যে মানুষটা চলে যাচ্ছে, তার মাথায় ঠেকিয়ে বলো, এর বেশি আমার কাছে দেওয়ার মত পাথেয় নেই আর। সে ফিরে যাক।
ফোন যখন এলো, আমার আবার মনে পড়ল সেই দু ঘন্টা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা চোখদুটো। কী বলতে চাইলে? আমাদের অনেক কথা বলা হয়নি, আমরা জানি, আবার দেখা হবে আমাদের। তুমি মা ভাই অপেক্ষা করো। আমিও আসব। কে থাকে চিরকাল এই জগতে। তোমার মুখে আগুন দিতে বলেছিল যখন আমি না তাকিয়ে দিয়েছিলাম। লেগেছিল কী? জানি না। তখন সূর্য অস্তে যাওয়ার তাড়ায়। আমারও ভীষণ তাড়া। যাও তুমি। মা ভাই অনেকদিন অপেক্ষা করে আছে তোমার। যাও যাও। আমি টিকে থাকব আয়ু যতদিন আছে। কোনো অভিযোগ নেই আমার। এই তো মাস পেরোতে গেল। এই তো তোমার ঘরে আলো জ্বেলে এসে বসলাম। এই তো লিখছি দেখো। সেদিন icu এর সামনে বসেও যেমন লিখেছিলাম। ট্রেনে, হাসপাতালের করিডোরে যেমন লিখেছিলাম। তুমি যাও। ওদের আর অপেক্ষা করিও না। আমি আসি। আমার জন্য থেকে গেল তোমার দুই ঘণ্টা তাকিয়ে থাকা দুটো চোখ। আমি তার মানে বুঝতে চেষ্টা করব। আমি দুঃসময়ে তার কাছে ছায়া খুঁজে নেব। তুমি আজীবন বলে গেছ, “ভাবিস না অত”….. আর ভাবার নেই…. কী ভাবব? কাকে নিয়ে আর উদ্বেগ আমার? চিতাতেও জল ঢালতে হয় নেভাতে গেলে। স্মৃতিতে? নেভে নাকি সে? স্মৃতি শান্ত হয় তর্পণে। এই আমার প্রথম তর্পণ। প্রণাম।