মেয়েটা খুব স্বাভাবিক না। মেডিক্যালি কী বলে তো বলতে পারব না, কিন্তু আচরণ, চাহনি একটু অন্যরকম। বাবা-মা দু'জনেই শিক্ষকতা করেন শুনলাম। বাবা কোনো এক প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। জিজ্ঞাসা করলাম, হঠাৎ এমন সময় শিক্ষক পরিবর্তনের আবশ্যকতা কী হল? উত্তর সেই এক। এক ঝুড়ি নিন্দা। এ জিনিসটা ভীষণ খারাপ লাগে। এতদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি যতটা না বাস্তবতা থাকে, তার বেশি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের দিকটাই বেশি থাকে। এক্ষেত্রেও তাই দেখলাম। কোনো অবজেকটিভ সমস্যা নেই। সবটাই “আমাদের ঠিক লাগছে না”। মেয়েটা এমন অনেক শিক্ষকের নাম বলল যারা অনেকে আমার সিনিয়র, অনেকে আমার সতীর্থ। অগত্যা নেওয়ার কথা ভাবতেই পারছি না। কিন্তু দুইজন মানুষের জোরাজুরিতে আর মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া লাগাতে "হ্যাঁ" বললাম।
কয়েকটা ক্লাসের পর বুঝলাম মেয়েটার আসলে কোনো বন্ধু নেই। বাবা-মা জীবিকার জন্য সারাটা দিন বাইরে থাকে। সে অনেকটা সময় একা থাকে। স্কুলে বা পড়ার ব্যাচে কোনো বন্ধু তার নেই। কারণ জিজ্ঞাসা করাতে বলল, সবাই হিংসা করে তাকে। সবাই তার ক্ষতি চায়। এক-একদিন এক-এক সহপাঠী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে অদ্ভুত সব অভিযোগের কথা শুনতে শুরু করলাম। অবশ্যই তার কোনোটাই বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিন্তু তাও বুঝলাম স্বাভাবিক নয়।
একদিন হঠাৎ আমার কাছে আসা বন্ধ করল। মাঝে মাঝে দুশ্চিন্তা হতে শুরু করল। কারণ যে মানসিকতায় মেয়েটা বড় হচ্ছে সেটা স্বাস্থ্যকর নয়। সেটা কী করে তার অভিভাবক কভার করে যাচ্ছে সেটা স্পষ্ট। কিন্তু তার পরিণাম? তার কথা কে শুনবে? তার প্রাক্তন স্কুলের, তার বর্তমান স্কুলের বন্ধুবান্ধবদের তাকে নিয়ে মনোভাব ইতিবাচক নয়। তবে?
তার বাবা-মা-কে মেসেজ করলাম, কল করলাম। কোনো রেসপন্স নেই। তার সহপাঠিনীর কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানলাম আমি মূল টেক্সট বইতে গুরুত্ব দিই, নোট্স না দিয়ে, সেটাই নাকি তার কারণ। সম্পূর্ণ ভুল কথা। কারণ আমি প্রথম দিনই সবাইকে জানিয়ে দিই নোট্স মুখস্থ করে বিজ্ঞান পড়তে এলে আমার কাছে সুবিধা হবে না, বইটা পড়তে হবে, বুঝতে হবে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
কিন্তু পড়াশোনা ইত্যাদি পরের কথা। আসল কথা হল মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এই উদাসীনতা। বিশেষ করে যারা শিক্ষকতার মত কাজের সঙ্গে যুক্ত, যাদের হাতে এত এত বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ের জীবন তাদের এমন উদাসীনতা আশ্চর্য করে। বাইরের লোকের সঙ্গে অভদ্রতা এক জিনিস আর যেটা সমস্যার একটা ইঙ্গিত দিচ্ছে তার উপর উদাসীন হয়ে থাকাটা আরেক জিনিস। আমাদের এখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খুব একটা সচেতনতা নেই। কোনো কোনো বিশেষ দিন পালনের মধ্যে দিয়ে, কিছু ভালো ভালো কথা বলে মঞ্চ থেকে, কাগজে-কলমে অনেক কিছু করার চেষ্টা হয়ে থাকে। এটা কি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা? আমার অভিজ্ঞতায়, না। আমাদের অনেকের কাছে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবা, কথা বলা এখনো বিলাসিতা। ওগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ইচ্ছাকৃত। বদমায়েশি। কাজ না থাকার জন্য মাথা গরম হয়ে যাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি কত ব্যাখ্যা আছে।
দিন দিন জীবনযাত্রার জটিলতার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক জটিলতা বাড়ছে। যা জানছি, যা অনুভব করছি, যা প্রত্যাশা আমি আমার কাছে রাখছি, আমার কাছে অন্যে রাখছে, আমি অন্যের কাছে রাখছি…. যে সফলতা ব্যর্থতা সমাজে, কার্যক্ষেত্রে, সম্পর্কে সম্মুখীন হচ্ছি তার সঙ্গে মোকাবিলা করার মত মানসিক অবস্থা যদি আমার না থাকে, যদি আমার সমস্যাকেও পাশের লোক উপেক্ষা করে, আনদেখি করে চলে যায়, তবে আমার উপায় কী? বন্ধুদের তামাশার পাত্র, কাছের লোকের বিরক্তির পাত্র, নিজের কাছে অসহায় নিষ্ফলতার বোঝা হয়ে বেঁচে থাকাই কি তার একমাত্র ভবিতব্য?
জানি না প্রতিটা স্কুলে স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা কবে থেকে শুরু হবে। কবে থেকে সামান্য কোনো অসঙ্গতি ব্যবহারে দেখলেই শৈশব, কৈশোরকালে অভিভাবকেরা সচেতন হবেন, উপযুক্ত প্রশিক্ষিত মানুষের কাছে নিয়ে যাবেন। কত কত জীবন যে অবশ্যম্ভাবী ব্যর্থতার হাত থেকে সেদিন রক্ষা পাবে! কিন্তু কবে? কারোর জন্য হাহুতাশ করা, "বেচারা" বলে ভুলে যাওয়া বড় কাজের কথা নয়। দায়িত্বটা কবে নেব? দায়িত্ববোধটা ডিগ্রি বা পদের উপর নির্ভর করে না। সেটা নির্ভর করে সংবেদনশীলতার উপর। কিন্তু যে জেগে ঘুমায়, তার বেলা?
Category
- Log in to post comments
- 1 view