Skip to main content

 

নিজের বিনয় প্রকাশ করার জন্য যখন প্রবন্ধের দরকার পড়ে তখন রবীন্দ্রনাথের এ ক'টা কথা স্মরণে আসে -

"বিনয়ের মুখে কথা নাই, বিনয়ের অর্থ চুপ করিয়া থাকা। বিনয় একটা অভাবাত্মক গুণ। আমার যে অহঙ্কারের বিষয় আছে এইটে না মনে থাকাই বিনয়, আমাকে যে বিনয় প্রকাশ করিতে হইবে এইটে মনে থাকার নাম বিনয় নহে।"

আজ এক প্রাচীন মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। মাঘের রোদে সে মন্দির প্রাঙ্গণ দারুণ মায়াময় হয়ে উঠেছিল। রোদ তো শুধু দেখার জিনিস নয়, সারা গা দিয়ে অনুভব করারও জিনিস।

এক বৃদ্ধা স্নান সেরে রোদে এসে দাঁড়ালেন। দৃষ্টি আর শ্রবণ দুই-ই পশ্চিমের আকাশে ঢলেছে। হাসিমুখে বললেন, কোত্থেকে আসছ? কানে কম শুনি।

সচ্ছলতা নেই বৃদ্ধার, কিন্তু শ্রী-টুকু বড় সুন্দর আর সারাটা অবয়ব জুড়ে ওঁর আছে। ভাবলাম এ পাড়ায় বিয়ে হয়ে এসেছেন কতকাল আগে! যার হাত ধরে এসেছিলেন তিনি হাত ছেড়ে গেছেন সিঁথি দেখে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু সে দিন কেমন ছিল? একজন যেমন বলেছিলেন, “তোমার দাদু যখন আমায় বিয়ে করে আনে সেদিন রেল স্টেশন এমন পাকা ছিল নাকি? তোমার দাদু আমারে কোলে করে ট্রেন থেকে নামিয়েছিল।” শেষের কথাটা বলার সময় এত যুগ পরেও সেই কালের ভাঁজ পড়া মুখে লাল আভা ফুটেছিল।

যা হোক, আজকের গল্পে ফিরি। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি যখন বিয়ে করে আসেন এ মন্দির ছিল?

উনি বললেন, ছিল, তবে পাকা হয়নি। এ মন্দিরে মাটির প্রতিমা ছিল। শাশুড়ির মুখে শুনেছি এ মন্দিরে মাটির প্রতিমা যে গড়ত সে আর বাঁচত না। তারপর কেউ মূর্তি গড়তে চাইত না। কার ছেলেমেয়ে বাবাকে গড়তে দেবে বলো? তারপর এই পাথরের মূর্তি। যদিও এসব আমার শাশুড়ির কাছে শোনা। সত্য মিথ্যা জানি না।

কী বলি ঠাকুমা, সত্য-মিথ্যা কেউই জানি না আমরা সংসারে। প্রয়োজন আর অপ্রয়োজনটুকু বুঝতেই বেলা গড়িয়ে যায়।

মনসাতলায় দুটো কুকুরের বাচ্চা খেলছে। মা তাদের একটু দূরে বসে খেয়াল রাখছে। বৃদ্ধা যেদিন এ গ্রামে এসেছিলেন তখন এ নিশ্চয়ই ছিল গণ্ডগ্রাম। আর তার শাশুড়ি? সে যখন এসেছিল?

বললেন, সামনে বড় উৎসব। তোমরা এসো। তোমাদের তো চিনতে পারব না বাবা অত ভিড়ে, তবু এসো।

বললাম, আমরা চিনে নেব আপনাকে। কথা বলেই যাব।

ফেরার পথে একজন বয়স্ক পুরুষ পথ আটকালেন, “কী কথা বলছিলেন ওই মনসাতলায়?”

বুঝলাম বৃদ্ধার অস্তিত্বটুকু মিটিয়ে ফেলতে চান শব্দব্রহ্ম দিয়েই।

বললাম, এই মন্দির নিয়ে।

সঙ্গে সঙ্গে স্বর বদলে কোমল হল। তীক্ষ্মদৃষ্টিতে আমার দৃষ্টি মাপতে মাপতে বললেন, আসবেন, সামনে উৎসব। এই, এই আমার বাড়ি।

দ্বিতল বাড়ি অবশ্যই গর্বের। অন্তত আশপাশের বাড়ির তুলনায়। সব ঠিক ছিল, কিন্তু বিনয়টাই খাঁটি সুরে লাগছিল না। বিনয়কে আসন পেতে বসতে বললে সে তো বসে না। কখন যে ধুলোয় এসে বসে আর ধুলোর মূল্যেই সব কিছুকে বিচার করে সে বোঝা দায়। তাই শাস্ত্র বিনয়ের সাধন কিছু বলেননি, সে গুরু কী ঈশ্বরের কৃপা নির্দেশ করেই ছেড়ে দিয়েছে।

ফিরতে ফিরতে বৃদ্ধার নিরুপদ্রব সুখী মুখটার ছবি মনে হতে লাগল। কয়েকটা গ্রাম পেরিয়েই ওনার বাপের বাড়ি। সে গ্রামে কেউ নেই ওর হয় তো বা এখন। কিম্বা আছে। ক'দিন পর এই গ্রামেই নিজের জীবনের শেষ দিনগুলো মিটিয়ে রওনা দেবেন মহাকালের রথে চড়ে। মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু তার গল্প ফুরিয়ে তো যায় না।

ফিরে একটা লেখা পড়লাম, এখানেই। কেউ একজন নিজের বিনয় প্রকাশের জন্য প্রায় দু'হাজার শব্দের বিনয়ের আলেখ্য লিখে ফেলেছেন। এ স্বাভাবিক। অহমিকার অপরাধবোধ মাঝে মাঝেই বিনয়ের প্রকাশভঙ্গী নকল করে আত্মশুদ্ধির উপায় খোঁজে। ওতে যে আরো সবটা বিশ্রী হয়ে যায় সে বোঝার অবস্থা থাকে না তখন।

মহতের কৃপা ছাড়া বিনয় আসা সম্ভব না, এটুকু বিশ্বাসে চুপ করে থাকাটাই শ্রেয় মনে হয় তদ্দিন।