Skip to main content

 

 

তার পাখা নয়। তার এই সিমেন্ট বাঁধানো বসার জায়গাটাও নয়। এই আলো, এই ট্রেন লাইন, এই টিকিটঘর, এইসব কিছুই তার নয়। সন্ধ্যেবেলা বসে থাকতে থাকতে ঝুলে থাকা ঘড়িটার দিকে চোখ যায়। লাল বিন্দু জুড়ে জুড়ে সংখ্যা ফুটে ওঠে। সময়ের পায়ের শব্দ। এ সময়ও তার নয়। আয়ু হিসাবে আটাত্তর সংখ্যাটা কম তো নয়। তবু কত কম। জীবনে মনে থাকে কতটা সময়? সব ঘটনা জড়ো করলে হয় তো দিন তিনেক, কী পাঁচ হবে। কিম্বা হয় তো কয়েক ঘণ্টা। কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কয়েকটা বিচ্ছিন্ন অনুভব, ব্যস, আর কী? অথচ আয়ু বলতে গেলে কত দীর্ঘ একটা সময়ের কথা। মানুষের ভাষায় কী সহজে মিথ্যা বলা যায়।

ট্রেন থেকে যারা নামে তারা বদলে বদলে যায়। কেউ ফিরে আসে, অনেকেই আসে না। জীবন কারোর জন্য অপেক্ষা করে না। অথচ গোটা জীবন মানুষ শুধু অপেক্ষাই করে। কীসের অপেক্ষা সে নিজেও স্পষ্ট জানে কি?

মানুষ একা, অসম্পূর্ণ। তাই এই বসে থাকা। হাঁটা। কথা বলা। মানুষ জন্মে থেকে নিজেকে গোটা বানাবার খেলায় মাতে। সুখ জুড়ে জুড়ে গোটা হবে ভাবে। হয় না। দুঃখকে মেনে নিয়ে গোটা হবে ভাবে। তাও হয় কই? এর তার কথার টুকরো, স্মৃতির টুকরো, হাসি, তাকানো, ছোঁয়া ইত্যাদি কীসের কীসের না টুকরো জোগাড় করে আনে? কটা জোড়ে? অচেনা মানুষ চেনা হয়। চেনা মানুষ অচেনা হয়। অবশেষে নিজেকে ভাঙতে শুরু করে। টুকরো টুকরো করে ভাসিয়ে দেয়। যত হারায় তত পায়। কী পায়? কে বলবে? সে কি নিজেও জানে কী পাচ্ছে? না। জানতে গেলেই মুঠো বাঁধে, মুঠোর ওজন মাপে। সব ভেস্তে যায়।

রাতে বাড়ি ফেরে। এ রাস্তা তার নয়। এই রাত তার নয়। এই শরীর মন তার নয়। কিন্তু হাত পা বাঁধা তার। এ জীবনকে পরতে পরতে না জানলে ছুটি নেই। সুখ দুঃখ, একা একা কথা বলে যায়। বুদ্ধি ভ্রান্ত হয়, আবার রাস্তা পায়। আবেগ দিশাহারা হয়, আবার দিশা পায়। ধীরে ধীরে এ খেলা অভ্যাস হয়ে যায়। যেমন তার হয়েছে। বিভ্রান্ত হলেও আর উদ্বিগ্ন হয় না তাই। দুঃখের আনুগত্য স্বীকার করে। কিন্তু দুঃখের মুখোশে বিভীষিকা ভয় দেখাতে এলে বলে, যাও। দুঃখ থাকে। ভয় চলে যায়। বারবার মনের মধ্যে একতারা বেজে ওঠে, আমি কিছু নই, কিছু নই, কিছু নই....বলতে বলতে বাড়ি চলে আসে। রাস্তা তাকে বাড়ি অবধি পৌঁছে এগিয়ে যায়। সে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে, একদিন যাব, যেখানে তুমি শুরুতে শেষ আর শেষ হয়ে শুরু, সেই মোহনায় দাঁড়াব। ঠিক যাব। সব ছেড়ে দিয়ে যাব। যেদিন বুঝব, আসলে আমার কোনোদিন কিছু ছেড়ে যাওয়ার নেই, ছিল না। কারণ কোনদিন কিছু পাইনি আসলে। ওটা ভ্রান্তি ছিল। হওয়ার ভ্রান্তি যেমন সুগন্ধের অধিকার। কী মিথ্যা। ভীষণ মিথ্যা। জীবন তো বাহক খালি। বহন করে কাকে? জানে না। লালন জানে।