এটা তো সত্যি বহু মেয়ের জীবনে উদযাপন করার মত কিছু আর অবশিষ্ট থাকে না। সিলিণ্ডারের টাকা, না হলে শুকনো কাঠ, ঘুঁটে জোগাড়, বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মীর সামনে রাখার গুজিয়া থেকে নেমন্তন্ন বাড়ির উপহার কেনা, সঙ্গে যাতায়াতের খরচ জোগাড় এসব তো আছেই। এ ছাড়া পরিবারের লোকেদের, আত্মীয়স্বজনের অসুখবিসুখ, বিপদআপদও আছে। আরো আছে অসময়ে এসে পড়া অতিথির খরচ।
সমাজে এইসব মহিলারা যে ধরণের কাজ করে থাকেন সেগুলোতে ছুটি বলতে সাধারণত কিছু হয় না। ছুটি নেওয়ার সমার্থক শব্দ সেখানে অপরাধ। সে অপরাধবোধ জন্মিয়ে দেওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থাও করা থাকে সমাজে। তাদের উপার্জনের রাস্তায় আরেকটা দিক হল অসম্মান। তাদের কাজের গুরুত্ব নিয়ে কারোর কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সম্মান? সেটাকে তারা উপরি পাওনা হিসাবে দেখে।
এই মহিলাদের জীবনে কীসের উদযাপন? নেই।
অথচ এদের অনেক কথা। অনেক গল্প আছে। মানুষ তো পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকার জন্য তৈরি নয়, কিন্তু স্বাভাবিক উচিত অনুচিত বোধ তার জন্মগত। পরিস্থিতি, চারিত্রিক কোনো দুর্বলতায় মানুষের তার থেকে চ্যুতি ঘটে না তা নয়। কিন্তু চ্যুতিটাই তার স্বাভাবিক অবস্থা নয়।
বই পড়ে কেউ রুচিশীল হয় বলে আমি বিশ্বাস করি না। মানুষের স্বাভাবিক ইনোসেন্সে আমার বিশ্বাস থাকলেও এক্ষেত্রে আমি ইম্যানুয়েল কান্টের অনুগামী। আমি সেই ইনোসেন্সে আস্থাভাজন নই। বরং তার সমীচীনতা বোধ ও সঙ্গতিবোধের উপর আস্থাশীল।
সমীচীনতা আর সঙ্গতিবোধ মানবিকতার ভিত। এ বোধ আলোচ্যশ্রেণীর বহু মহিলার মধ্যে এমন স্বাভাবিক বুদ্ধিতে দেখেছি যারা অহরহ না-সন্মানে থাকাতেই অভ্যস্ত। তাদের কথা বইপড়া বুলি নয়। হৃদয় আর বুদ্ধির সংমিশ্রণে জীবন যে অভিজ্ঞতার পাঠ তাকে দিয়ে চলেছে, তারই কথা সে বলে।
তাদের জীবনে আনুষ্ঠানিক কোনো উদযাপনের দিন নেই। কিন্তু প্রতিদিন তাদের মুখোমুখি হতে পারা আমার নিজের জীবনের অনেক অভাব অভিযোগ ভুলিয়ে দেয়। আমি ভাষা শিখি তাদের কাছ থেকে। যে ভাষা আমাকে বারবার এই দুঃসময়ের কুরুচিকর ভাষা থেকে মুক্তি দেয়। শুদ্ধি দেয়।
যাকে পছন্দ করি না, যার সঙ্গে আমার মতে মেলে না তাকে যে ঘৃণাই করতে হবে এমন তো কথা নেই। ঘৃণার ভাষা আর ঘৃণাকে আড়ালে রাখার ভাষা দুই-ই ভীষণ বিষাক্ত। একজন নির্লজ্জ, একজন ছল। দুই-ই ভয়ানক। বরং দ্বিতীয়টা আরো ভয়ানক।
ঘৃণাহীন উষ্মার ভাষাও আমি শিখেছি এই মানুষদের থেকেই। একটা উদাহরণ দিই। একবাড়ি কাজ করতে গেলে তাদের কাজের বউকে জলখাবার দেয় শুকনো পাউরুটি। সে কদিন গেলার পর বলেছে, বউদি, আপনি বরং আমাকে সকালে কিছু দেবেন না, এই পাউরুটি আমি গিলতে পারি না গো।
তারপর একদিন এ গল্প করতে করতে সেই কাজের মানুষটা বলছেন, আসলে দাদা, ওই বউদি ভীষণ কুঁড়ে। কদ্দিন স্নান করে না জানো, শুধুই ভালো লাগে না বলে।
তার কমাস পরে সেই মানুষটাই বলল, আমি কদিন দেরি করে বাড়ি যাচ্ছি জানো। ওই বাড়ির বউদিটা সিঁড়ি থেকে পড়ে পা ভেঙেছে। একটু খাইয়ে না দিলে নিজে উঠে খাবেও না। ওরকম একটা মানুষকে ফেলে আসা যায়?
এটাই বলছিলাম। আজ সমাজ মাধ্যমে শিক্ষিত মানুষেরা অনেকেই যে বাংলায় কথা বলে, যে ইঙ্গিতে কথা বলে তা শুধু ঘৃণার বিকারেই সম্ভব। আর এর উল্টোদিকে যে কৃত্রিম ভদ্রলোকের ভাষায় কথা হয়, তা আপাদমস্তক সত্যহীন। একজন সত্যের অমর্যাদায় সত্যকে উপেক্ষা করে। আরেকজন সত্যের থেকে নিজের বাকচাতুরীকে ভরসা করে বেশি।
কালের নিয়মে দুই-ই চলে যাবে। কারণ সত্যকে অস্বীকার করে চলার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। ব্যর্থতাও নতুন কিছু নয়।
অন্যদিকে আমার আলোচ্য মানুষগুলোর সব কাড়তে পেরেছে সমাজ, এক সত্য বাদে। দার্শনিক সত্য নয়। খিদে, অপমান, শোষণের সত্য। এরাই পথ দেখাবে। উদযাপনের মাধ্যমে নয়। জীবনের মাধ্যমে। না হলে এদের এত এত লড়াইয়ের গল্প, এত অপমানের বিষ হজমের কাহিনী কে বলবে? না শুনে মহাকালই কি ত্রাণের পথ পাবে?