সকালে স্নান সেরে ফুল তুলতে গিয়ে পায়ে কাঁটা বিঁধল। ঝুঁকে দেখল রক্ত। কয়েক বিন্দু ঘাসে লেগে। ঘাসে রক্তের দাগ দেখে মনে পড়ল মামাবাড়ির কথা। ঘাসের উপর মুরগী কাটা হত। দুপুরে খাওয়ার পরে বিকেলে ঘাসে গিয়ে দেখত রক্তের দাগ শুকিয়ে গেছে।
ঘরে এসে পা ধুলো। এন্টিসেপটিক মলম লাগিয়ে পা ঝুলিয়ে বসল চা নিয়ে। চা খেয়ে পুজোয় বসবে।
কলিংবেল বাজল।
সরস্বতী পুজোর চাঁদা। এত সকালে এলি কেন রে?
সন্ধ্যেয় তুমি থাক না তো।
ঠিক। চাঁদা দিয়ে বসল। চায়ের কাপের একটা কোণা ভেঙেছে। কদিন চলল? এবারে গ্যাস কদিন চলল? প্রেসারের ওষুধটা কদিন আছে আর?
স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিল। অবসর নেওয়ার পর বাগান নিয়ে থাকবে ভেবেছিল। কিন্তু যেমন ভেবেছিল তেমন হল না। বাগান মন জুড়ে বসল না, জমি জুড়েই থেকে গেল। আজকাল বরং ঝঞ্ঝাটই লাগে। একটা ধূমকেতুর মত শূন্যতা সব সময় চিন্তার আকাশে আটকে। সে ধূমকেতুর রং ধূসর। আজকাল স্বপ্নেও চলে আসে। মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে বলে আমার দিকে তাকাও। এই যে আমি।
========
কদিন আগে কয়েকজন কলেজের ছেলে এসেছিল। সে বলল আমাকে দিদি বলে ডাকো। ওরা এই জায়গার ইতিহাস নিয়ে কাজ করছে। সে বলল, তোমরা চা খেয়ে যাও। তোমরা বসো। আরো কথা জানতে চাইলে বলো, আমি সাহায্য করছি।
এই আন্তরিকতাটা অভিনয়। আসলে কাঙালপনা। হাত বাড়িয়ে ধরতে চাওয়া নয়। ছুঁতে চাওয়া নয়। কাড়তে চাওয়া। নিজের করে আগল দেওয়া।
কথা বলতে বলতে নজর যাচ্ছে শাড়িতে, বসার ভঙ্গিতে, উচ্চারণে যেন কোনো গ্রাম্যতা না ধরা পড়ে। যতই হোক না স্কুলের দিদিমণি, আসলে তো গ্রামের মেয়ে।
ছেলেগুলো ভালো। কথা বলছে সহজ হয়ে। কিন্তু ধূমকেতু চওড়া হচ্ছে আরো।
তারা চলে গেল। যোগাযোগ করেনি আর। যদিও কথা দিয়েছিল যোগাযোগ করবে। ফেসবুকে খুঁজে খুঁজে বার করেছে। কিন্তু অত অবধিই। আর এগোনো যায় নাকি?
বাগানের অযত্ন বাড়ল আরো। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা কমল প্রায় না এর মত। সেদিনের একটা সকাল, এত কিছু কেড়ে নিয়ে গেল? জোর তো করেনি ওরা, সে নিজেই দিয়েছিল। কী দিয়েছিল? নিজের লজ্জা, আত্মসম্মান। ওরা বোঝেনি। সে নিজে তো বুঝেছিল।
=======
পায়ের ব্যথাটা বাড়ল রাতে। জোরে চাপ দিতে রক্ত বেরোলো আবার। মেঝেতে পড়ল। শোয়ার ঘর থেকে বসার ঘরে এসে বসল। যে খাটে ওরা বসেছিল, যে চেয়ারে বসেছিল, সেখানে গিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বসল। একটা একটা পোশাক খুলে রাখল মেঝেতে। শীত তো আছে। আর এ গ্রামেগঞ্জে তো আরো। খাটে বসল। চেয়ারে বসল। শরীরের সেই আঁটোসাঁটো ভাবটা নেই। শিথিল মাংসে, পেশীতে হাড়ের ধাক্কা লাগল। বিছানার চাদরে রক্ত লাগল আবার। কী পাগলামি করছে? কে সে? একা একা নিজের কাছে এইভাবে আত্মপরিচয় খোয়ায় মানুষ? হা ঈশ্বর!
ঈশ্বর! সন্ন্যাসী। তখন কলেজে পড়ে। এক দাদা গেল অস্ট্রেলিয়া, পড়তে। এক দাদা হল সন্ন্যাসী। সাধুসঙ্গ হতে শুরু করল আর প্রচুর পড়াশোনা। দাদারা বলল, ঈশ্বর আর মানুষের সেবা এক। নিজেকে সঁপে দাও। দুই দাদাই বলল। দাদারা তার কাছে আদর্শ। ভগবান। ধরাছোঁয়ার ভগবান। ভেবেছিল সন্ন্যাসীনী হবে। স্কুলে চাকরি এলো। দাদারা বলল, এই বেশ। সংসারে মা বাবাকে দেখতে দেখতে করো সেবা। সঙ্গে সাধনা। দীক্ষা নাও। সেবা আর নিজের আত্মার মুক্তি, এই তো চাইতেন স্বামীজী।
দিয়ে দিল। মা বাবার সেবা শেষ হল পারলৌকিক কাজের সমাপ্তিতে। দাদারা ক্রমে হল দূর। এখন মনেই পড়ে না তার কোনোদিন ধরাছোঁয়ার মধ্যে ভগবান ছিল। এখন শুধু ওই ধূসর ধূমকেতু।
========
জোর করে না থামালে কত রাত অবধি চলত পাগলামি? ভোর অবধি বসে থাকল বসার ঘরে। শোয়ার ঘরে ভয়। ওই ধূমকেতুটা শুয়ে আছে বিছানায়। ওর আজকাল শরীর গজাচ্ছে। হাত পা দিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে।
হিংসা কী জিনিস স্পষ্ট ধারণা ছিল না। সে জানত সে অনেক উঁচু তলার মানুষ। ঈশ্বর আর দাদারা ছাড়া তার সমকক্ষ কে আছে সংসারে, কী সংসারের বাইরে? তাই ঈর্ষা কোনোদিন অনুভব করেনি। এখন করে। সংসারের ওই ছোট ছোট সুখের জন্য ক্ষোভ হয়। ক্ষোভ হয় বলে রাগ হয়। কিছু করতে পারে না বলে হতাশ লাগে। হতাশ লাগে বলে সব ব্যর্থ লাগে। এত সামান্য সে? এত কাঙাল?
গতকাল রাত থেকে খায়নি কিছু। একবার বাইরে বেরিয়ে ঘাসে দেখে এলো রক্তের দাগ। শুকিয়ে গেছে। ঘরে ঢুকে ফ্রিজ থেকে ইনসুলিনটা নিল। কী সহজ সব। বিজ্ঞান জীবনকে বলেছে তুচ্ছ। সূত্রকে বলেছে সত্য।
সব জানলা বন্ধই ছিল। ফেসবুক খুলে বসল। পাশে রাখা ইনসুলিন। ছেলেগুলোর প্রোফাইলে গেল। কত তাড়াতাড়ি ছবি বদলায় এরা। অথচ তার ছবিটা কত পুরোনো। পুরোনো শুধু না, যৌবনের। সাদা কালো ছবি। হোক। কী চুল ছিল, কী রং, কী চোখ, কী সুন্দর হাসি। চেহারাও তেমন। লোকের নজর পড়ত। সে গর্বের সঙ্গে তুচ্ছ করে ভাবত, এরা এ ধুলোকাদার পৃথিবীর। বড় স্থূল।
ছেলেগুলোর প্রোফাইলে ঢুকে পোস্ট দেখতে দেখতে চমকে গেল এক জায়গায়। এ তো তার বাগানের ছবি! এই তো তার ছবি, বাগানে দাঁড়িয়ে। তলায় লিখেছে, দিদিমণির সঙ্গে, দিদিমণির বাড়িতে। সারাটা শরীর দিয়ে হিমের স্রোত নেমে গেল। সব ফাঁকি যেন বাগান হয়ে ঘিরে ভেঙচি কাটছে তাকে। কী বলে তারা ওকে নিয়ে? কী আলোচনা করে? মেসেজ করবে? আশীর্বাদ দেবে না হয়। শুধুই আশীর্বাদ। ঘাসে লাগা সে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত সূর্যের তেজে যেন উষ্ণ হয়ে গলে গেছে। সে গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে তার ঘরের দিকে। তাকে ডাকছে। বলছে, বল, বল, মিথ্যার চেয়ে বড় পাপ নেই দুনিয়ায়।
ইনসুলিনটা খামচে ধরল। দরজায় আওয়াজ হল। বেল বাজল। কাজের মেয়েটা এসেছে। সাড়া দিচ্ছে না। সে ডাকছে দিদি….দিদি….। সিরিঞ্জটা খোলা। উষ্ণ রক্তের স্রোত গোটা ধূমকেতুর শরীরকে জাপটে ধরেছে। কাঁচের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। ফেসবুকটা আবার খুলল। মেসেজ বক্সটা ফাঁকা। অথচ কত মেসেজ থাকার কথা ছিল যদি বাতাস লিখতে জানত। কাজের মেয়েটা বন্ধ জানলার ওপাশে দাঁড়িয়ে ডাকছে, দিদি দিদি…..
আসছি….