Skip to main content

 

 

বাংলায় ‘জ্ঞানপাপী বলে’ একটা শব্দ আছে। গ্রীক দর্শনেও এই শব্দটার মত একটা শব্দ আছে, অ্যামাথিয়া। এর মানে অজ্ঞতা নয়, এর মানে অজ্ঞতাই আমার পছন্দ। ওই, জ্ঞানপাপী। জেনেশুনে চোখ বন্ধ করে থাকা।

আমাদের একটা বিশ্বাস আছে যে সত্যের চাইতে সংখ্যা বড়। যত বেশি মানুষ যত বেশিদিন ধরে বিশ্বাস করে আসছে সেটা ততটাই সত্য। বুদ্ধ এ তত্ত্ব খারিজ করেছিলেন। ভারতবর্ষ বুদ্ধকেই খারিজ করে দিল। আমাদের অতীন্দ্রিয় অনুভব চাই। ঈশ্বরের সঙ্গে রীতিমত পাড়ার দোকানে আড্ডা হয় এমন জাতের মানুষ চাই। আমাদের ঈশ্বরে বিশ্বাস অবিশ্বাস বড় কথা না, আমাদের ঈশ্বরের সঙ্গে গলাগলি সম্পর্ক আছে কিনা সেটাই বড় প্রশ্ন। আমরা ঈশ্বর রোম্যান্টিক জাতি। মানুষ? আছে। তার নানা বর্ণ আছে। তার জাত আছে। তার উঁচুনীচু আছে। তার ছোঁয়াছুঁই আছে। মানুষকে আমরা অত সহজে হুট করে মানুষ বলে ফেলতে নারাজ। আমাদের বর্ণাশ্রম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আছে। তার জন্মসূত্র ধরে তার অধিকার যোগ্যতা মান্যতার মাপকাঠি আমাদের পূর্বপুরুষেরা ওই নিরকার ব্রহ্মের মাধ্যমেই পেয়ে এসেছেন। গীতাতেও আছে তিনিই মানুষকে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র করে জন্ম দিয়েছেন।

আমাদের ইদানীং ধর্মচর্চা খুব বেড়েছে। তাই আমাদের খাওয়াদাওয়ার বাছবিচার, জাতপাত, বিশ্বাস অবিশ্বাসের তর্কাতর্কিও বেড়েছে। এখন ধর্ম হল এমন একটা বস্তু যার উত্তর তর্কে পাওয়া যায় না। স্বয়ং উপনিষদ বলছেন যে ব্রহ্ম সত্য বটে, তিনি আজও আছেন, কালও তোমার হৃদয়ে আছেন বটে, কিন্তু তাঁকে তর্ক করে জানা যায় না, মেধার দ্বারা জানা যায় না, এমনকি বহু বই পড়েও যে জেনে ফেলবে, সেটিও হবার নয়। তবে? তুমি চাইবে, তিনি কৃপা করবেন, তবেই জানা যাবে।

কিন্তু এই ‘কৃপা’ কথাটা আজকাল বড় শোনা যাচ্ছে না। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলতেন চাপরাশ পেলে তবে তাঁর কথা বলা যায়। এখান এই ‘চাপরাশ’ কেউ পেয়েছে কি পাইনি তার কোনো সিলেক্টিভ এক্সাম হয় না। আজকাল অনেকেই দেখছি এই সোশ্যাল মিডিয়াতেই প্রফেসি করতে শুরু করছেন। “তোর হয়ে যাবে”, “অমুক দিন অমুক করলে এইটি হয়ে যাবে”। তন্ত্র থেকে বেদান্ত, ভক্তি থেকে ক্রিয়াযোগ, কী নেই এই মার্কেটে। সবাই বলছে এইটাই হল আসল ধর্ম। নাও ঠেলা। কেউ চাপরাশের ধার ধারে না, কেউ কৃপার ধার ধারে না। অনেকেই প্রফেসি করছেন। মানে আর কী ভবিষ্যৎ বলে দিচ্ছেন।

কিন্তু কথাটা হল যার উত্তর তর্কে পাওয়া যায় না, তার উত্তর তো কোন্দল করে, মারামারি করে, গালাগাল করেও পাওয়া যায় না। মন্দ পথটা তো পথ নয়। ভালো পথটা পথ। মন্দটা মন্দই বলেই মন্দ। ভালোটা ভালো বলেই ভালো। মন্দ কোথাও নিয়ে যায় না। ডুবিয়ে দেয়। ভালো নিয়ে যায়। আলোর মত হয়ে রাস্তা দেখায়। তাই যেখানে তর্কে উত্তর পাওয়া যায় না সেখানে মরমীরা বলে থাকেন ভালো হলে সে উত্তর পাওয়া যায়। ‘চিত্তশুদ্ধি’ কথাটা বিবেকানন্দ যে হরদম বলে যেতেন সেটা তো কোনো বাতিক থেকে নয়, উপলব্ধি থেকেই তো বলতেন।

অ্যামাথিয়া বা জ্ঞানপাপী হয়ে থাকাটা খুব কাজের কিছু না। বোকা বোকা ব্যাপার। আজকের এই এআই এর যুগে দুরকম অন্ধ হয়ে থাকা যায়। এক, জানি না। দুই, জানতে চাই না। প্রথমটা স্বাভাবিক। দ্বিতীয়টা বায়াসনেস। আমার কম্ফোর্টজোনের বাইরে আমি যাব না। সঙ্গে দোসর হয়েছে এক ঘাটের মড়া অ্যালগরিদিমের আজব ভুলভুলাইয়া। যত বেরোতে যাবে ততই সে দুয়ারে দাঁড়ায়ে বলবে, না না না। নাও ঘুরে যাও অ্যালগরিদিমের চক্করে। ক্রমে মন বিশ্বাস করবে এই তোমার অ্যালগরিদিমই একমাত্র সত্য। এইভাবে সবাই যে যার অ্যালগরিদিমকে ধ্রুব জেনে ঘন্টাকর্ণের মত ঘুরে বেড়াবে। কেন সে কানে ঘন্টা বেঁধে রাখত জানেন তো? আমাদের পুরাণের গল্প। যাতে সে নিজের ইষ্টদেবতার বাইরে অন্য কোনো দেবদেবীর নাম বা গুণগান না শুনে ফেলে। এরকম ঘন্টাকর্ণের ছড়াছড়ি আমাদের এই সোশ্যালমিডিয়ায়। অ্যালগরদিম সেই ঘন্টাটাই অহরহ জোর সে বাজিয়ে বাজিয়ে কানে তালা লাগিয়ে রাখছে তার।

বাস্তবিক সত্য কঠিন। জটিল। বহুমাত্রিক। ডিম্যাণ্ডিং। ইনক্লুসিভ। সময়ে সময়ে অস্বস্তিকর। ব্যায়সাধ্য। সময়সাধ্য। শ্রমসাধ্য। কিন্তু কাল্পনিক সত্য নরম, একমাত্রিক, হিংসুটে, দলীয়, সহজলভ্য, আরামদায়ক। তাই অ্যামাথিয়ার নরম বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাল্পনিক সত্য রঙিন থেকে রঙিন হয়ে ওঠে। বাস্তবিক সত্য ওই বিছানাটুকু বাদ দিয়ে বিরাজ করে ত্রিভুবন ব্যেপে একা। অবশেষে হাতে থাকে একটা নরম বিছানা আর মিথ্যা ঘুম। বছরে একবার করে “জাগো দুর্গা” বলে শেষরাতে জেগে আবার ভোররাতে ঘুমিয়ে পড়ার পালা চলে। এতে আর কী হয়?

↑