গতকাল গুরুপূর্ণিমা গেল। হালিশহরে অনেক আশ্রম, অনেক সম্প্রদায়ের মানুষ। বাড়িতে, আশ্রমে বেশ উৎসবের আমেজ ছিল। মন্ত্রোচ্চারণ, নামসংকীর্তন, যজ্ঞ, পুজো, ভোগের আয়োজন ইত্যাদি সব ছিল।
বেশ কিছু বছর ধরে আধুনিক সময়ে দীক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে চর্চা করছিলাম। কারণ কয়েকটা ছিল। এক, ধর্মের আচরণের দিকটা জানা; দুই, প্রাচীন দীক্ষাদানের উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ইত্যাদির সঙ্গে বর্তমান নানাবিধ সম্প্রদায়ের কী মিল, অমিল জানার চেষ্টা করা; তৃতীয়, এবং সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ দিক আমার মনে হয়েছিল, এই যে একটা মানসিক অভ্যাস, এর প্রভাব মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে তার ধারা কোন দিকে? কারণ বহু মানুষের প্রত্যক্ষ অবজেক্টিভ কোনো স্থায়ী পরিবর্তন হোক চাই না হোক, কিন্তু এই ধরণের মানসিক অভ্যাসের ফলে তার মনে কোনো বিরূপ ফল হয় কী না লক্ষ্য করা। সে উদাহরণও পেয়েছি।
আজকাল কুলগুরুর থেকে দীক্ষার চাইতে প্রাতিষ্ঠানিক দীক্ষার চল বেশি। যেমন রামকৃষ্ণ মিশন, ইস্কন প্রভৃতি নানা বৈষ্ণব সম্প্রদায়, দেওঘরের সৎসঙ্গ, নিগমানন্দ আশ্রম, রাম ঠাকুর সম্প্রদায়, আনন্দময়ী মা সম্প্রদায়, শ্রীগুরু সম্প্রদায়, ওঙ্কারনাথ সম্প্রদায় ইত্যাদি ইত্যাদি। আরো অনেক নাম বাদ পড়ে গেল। সেটা ইচ্ছাকৃত না। সেই সব সম্প্রদায়ের মানুষেরা এ লেখা পড়লে আমাকে মার্জনা করবেন। আমার এই মুহূর্তে যে ক'টা নাম মনে এলো তাই লিখলাম। এখানে আরো একটা কথা উল্লেখ করা দরকার। দীক্ষার প্রচলন নেই এমন অনেক ভক্ত সম্প্রদায়ও আছে, যেমন লোকনাথবাবা, সাঁইবাবা ইত্যাদি। তাদের নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র আমার বর্তমানের এ লেখার প্রসঙ্গ না। তাই সেইদিকে আপাতত গেলাম না।
সব সম্প্রদায়ের কয়েকটা দিক একই রকম। যেমন, একজন গুরু আছেন, যিনি অবতার, সদগুরু নামে অভিহিত। যিনি সেই সম্প্রদায়ের প্রধান পুরুষ। রামকৃষ্ণ মিশন, দেওঘরের সৎসঙ্গ, ওঙ্কারনাথ সম্প্রদায় প্রমুখেরা তাঁদের আরাধ্য গুরুকে ঈশ্বরের অবতার হিসাবে দেখেন ও প্রচার করেন। বাকিরা সিদ্ধ পুরুষ, সদগুরু হিসাবে দেখেন। এখানে একটা কথা আছে। 'গুরু' কথাটা বৈদান্তিক পরম্পরার ঐতিহ্যবাহী হলেও 'সদগুরু' শব্দটা কিন্তু নয়। ভক্তি আন্দোলনের যুগে নানক, কবীর, রবিদাস, নাথ সম্প্রদায়ের মাধ্যমে এই শব্দটার প্রচলন বিস্তারিত হয়। এই ভাবের মধ্যে গুরুতত্ত্ব ছাড়াও ইসলামের পীর ইত্যাদির ভাবের ছোঁয়াও দেখা যায়। যেমন শিরডি-র সাঁইকে 'সদগুরু' বলা হয়।
যে কথাতে ছিলাম। এই সব সম্প্রদায় একজন অবতার বা গুরু দিয়ে শুরু হচ্ছে। বৈষ্ণব সম্প্রদায়েরও যত ভাগ আছে সেখানেও একজন মূল প্রবর্তক দেখা যাচ্ছে, যেমন ইস্কনের প্রভুপাদ। সেই সেই অবতার বা গুরুর বাণী সেই সম্প্রদায়ের মূল ভাবধারা। সঙ্গে চিরাচরিত আচার-অনুষ্ঠান যে সম্প্রদায় যতটা নেন।
এবার আসি দীক্ষার প্রসঙ্গে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে কিছু পূর্বশর্ত মেনে একটা ফর্ম ফিল-আপ করতে হয়। একটা নির্দিষ্ট দিনে উপস্থিত হতে হয়। কোথাও সবাইকে একই সঙ্গে একই মন্ত্র দেওয়া হয়, যেমন রামকৃষ্ণ মিশন; কোথাও নিজ নিজ ইষ্ট দেবদেবী নির্বাচন করতে বলা হয়, তারপর সেই অনুযায়ী গুরু বা আচার্যদেব মন্ত্র দেন। যেমন আনন্দময়ী মা সম্প্রদায়, নিগমানন্দ সম্প্রদায় প্রমুখেরা; কোথাও কোনো নাম দেওয়া হয়, মহানাম বা সৎনাম ইত্যাদি। সৎনাম সম্প্রদায় অনুযায়ী ভিন্ন। নাম আর মন্ত্রের প্রভেদ হল নামের আগে কোনো বীজ থাকে না, যেমন - হরে কৃষ্ণ। আর মন্ত্রতে ওম, হ্রীং ইত্যাদি বীজ থাকে।
প্রতিষ্ঠান বড় হলে, ভক্তের সংখ্যা অত্যাধিক হলে গুরু আর শিষ্যের প্রায়শই কোনো ব্যক্তিগত যোগাযোগ থাকে না। যিনি দীক্ষা নিতে আসছেন, পূর্বতন নিয়ম অনুযায়ী তার আধার, মানসিক প্রবণতা, স্বভাবের বৈশিষ্ট্য ইত্যাদির পরীক্ষাপূর্বক দীক্ষা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রশ্ন হল, এই যে এত এত দীক্ষা হচ্ছে প্রতিদিন, এই এত এত গুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক গড়ে উঠছে, এই যে এত এত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান হয়ে চলেছে, এর কী কোনো বাস্তবিক প্রভাব সমাজে পড়ছে? সত্যিই কি দীক্ষা একজন অমানুষকে মানুষ করতে পারে? চরিত্র পরিবর্তন কী আদৌ দেখতে পাচ্ছি চারদিকে দীক্ষার পরে? অনেক মানুষ কী অদ্ভুতরকম মানসিক অভ্যাসের ফলে, নানাবিধ অতিজাগতিক বিশ্বাসকে বাস্তবের দুনিয়ায় কায়েম করতে গিয়ে মানসিক ব্যাধির দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন না? হয় তো তার লক্ষণগুলো শুরুতেই খুব স্পষ্ট নয়, কিন্তু ধীরে ধীরে তার প্রকোপ বেড়ে উঠছে না? স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, ধর্মের জগতে এসে একদল মানুষ উন্মাদ হয়ে যায়, 'শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গে' এ কথার উল্লেখ তো আছে। তবে? আজ যখন গোটা দীক্ষা পদ্ধতিটাই ভীষণ প্রাতিষ্ঠানিক, মেকানিক্যাল, আনুষ্ঠানিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যেখানে একজন আরেকজনকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না, অথচ জপধ্যান নামক একটা মানসিক অভ্যাসে বেঁধে দিচ্ছেন, তার পরিণতিকে খুব কাছ থেকে পরীক্ষা করার কোনো উপায় কী আছে? অনেকেই কয়েক বছর যেতে না যেতে উৎসাহ হারিয়ে, বা বাস্তবিক কিছু হচ্ছে না দেখে ছেড়ে দেন সব। কেউ একটা অপরাধবোধ নিয়ে বাঁচেন, কেউ একটা অসম্পূর্ণতার ক্ষোভ, হতাশা নিয়ে। তারপর? অনেকেই নিয়ম মাফিক করে যান। অনেকে বেশ প্যাটার্নে কিছু কথা শিখে যান ।পাড়াপ্রতিবেশী, আলোচনায়, তর্কে সেই প্যাটার্নে যুদ্ধ চালিয়ে যান। অনেকে আবার উন্নাসিকতায়, হামবড়া ভাবে, শুচিবায়ুতায়, কঠোর বিধিনিষেধে সাধারণ মানবিক ব্যবহারগুলোও ভুলে যান। মানুষের একটা অসম্ভব ক্ষমতা হচ্ছে নিজেকে ভুল বোঝানোর। এ ক্ষমতা না থাকলে বহু সংসারই 'সুখের সংসার'-এর মুখোশ পরে টিকে থাকতে পারত না, এ সত্য। কিন্তু তার সান্ত্বনা হচ্ছে সেটা অনেক মানুষকে নিয়ে চলার একটা কৌশল। কিন্তু এই ক্ষেত্রে? এখানে তো নিজেকে নিজের আঙিনায় বঞ্চিত করা! নিজের দুর্বলতাকে একটা মিথ্যা ঠেকনা দিয়ে ছলনায় ভুলে থাকা। এর পরিণাম কি সত্যিই ভালোর দিকে? প্রাতিষ্ঠানিক গৌরবচ্ছটার আড়ালে নিজের ব্যর্থতা, সংশয়কে নিজের মধ্যে স্বীকার করতেই অনেকে দ্বিধা বোধ করেন। ফলে আধা বিশ্বাস আর আধা সংশয়ে সে মানুষটা এমন একটা দঁকে আটকে পড়ে, যার এর চাইতে কোনো আনুষ্ঠানিক দীক্ষার মধ্যে দিয়ে না গেলে হয় তো বা সত্যিকারের আত্মিক উন্নতি হত। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “আলোরে যে লোপ করে খায় সেই কুয়াশা সর্বনেশে…" (আমার আঁধার ভালো)।
মহাপ্রভু, মীরা, চৈতন্যদেব, কবীর, নানক, রবিদাস ইত্যাদির সময়ে যে ভক্তি আন্দোলন হয়েছিল সেখানে দুটো দিকের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এক, গুরুকরণের মাধ্যমে দীক্ষা; দুই, বর্ণাশ্রমের বাঁধনকে শিথিল করা।
প্রথমটার আলোচনায় আসি। স্বয়ং চৈতন্যদেব নিজে আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষিত হয়েও বলেছেন দীক্ষার দরকার নেই, শুধু কৃষ্ণনামেই হবে। অর্থাৎ কাউকে অথোরিটি করতে চাননি। আজ যেটা বহু প্রতিষ্ঠান কয়েকজনকে অথোরিটি করে দিচ্ছেন। যারা বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন বিশ্বাস করতে বলা হচ্ছে। যারা স্ব স্ব পরম্পরাকে, সম্প্রদায়কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৎপর অবশ্যই।
কিন্তু যার প্রাণে সত্যকারের ঈশ্বরকে জানার ব্যাকুলতা জন্মেছে, যে সত্যকেই চাইছে কেবল, সে কী কোনো পরম্পরার শুদ্ধতা রক্ষা, কিম্বা সম্প্রদায়ের সদস্য সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় পাবে? তার পিপাসা কি তাকে এ সব সংকীর্ণতা থেকে ঊর্দ্ধে রাখবে না? সে কি যিনি যত বিখ্যাত মান্যই হোন না কেন, তার ব্যাখ্যায় 'শান্তি'লাভ করে ঘরের কোণে পড়ে থাকবে? নিজের থেকে উপলব্ধি করতে চাইবে না?
এর উত্তর আজকের সময়ের এই প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক, পরম্পরা ও সম্প্রদায়সর্বস্বতায় নেই। এর উত্তর সেদিনের কবীর, নানক, মীরা, প্রমুখের গানে ছিল। চরিতামৃতে ছিল। প্রশ্ন হতে পারে, তার সবটাই কি গ্রহণযোগ্য? অবশ্যই তার উত্তর দেওয়া বাহুল্য। কারণ প্রশ্নটাই প্রাতিষ্ঠানিকতার মূল মানসিকতা।
ভক্তি আন্দোলন যেভাবে জাতপাতের বেড়া ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, আশ্চর্যের কথা হল কলোনিয়াল যুগে যে সমস্ত হিন্দু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠল তারা কিন্তু তেমনটা হলেন না। অনেক প্রতিষ্ঠান উদাসীন রয়ে গেলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান হ্যাঁ/না-এর মাঝামাঝি একটা অবস্থান খুঁজলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান খুব জোরের সঙ্গে বললেন, হিন্দুধর্মে বর্ণাশ্রমের অবমাননাই হিন্দুর পতনের কারণ। এখানে 'প্রতিষ্ঠান' আর 'সম্প্রদায়' শব্দদুটো আমি একই অর্থে ব্যবহার করছি। তবে বর্ণাশ্রম নিয়ে আলোচনার পরিসর এটা না। ক'দিন আগে একটা প্রতিষ্ঠানের পত্রিকায় দেখছিলাম, ব্রাহ্মণ কেন জন্ম থেকেই ব্রাহ্মণ, কেন সে পুজ্য ইত্যাদি নিয়ে দীর্ঘ প্রবন্ধ। এটা কিন্তু আশ্চর্যের যে বর্ণাশ্রমকে কায়েম রাখার পেছনে যুক্তির অভাব কলোনিয়াল আর জাস্ট পোস্ট কলোনিয়াল যুগের হিন্দুধর্মের নতুন প্রচারকদের হল না। তাই ভক্তি আন্দোলনে যে খোলা হাওয়া এসেছিল ক্রমে তা আবার নানা বেড়াজালে আটকে গেল। কিছু উচ্চমার্গের দার্শনিক আলোচনা হল বটে, কিন্তু সেটা ইন্ট্যালেকচুয়াল জগতেই কয়েক বিন্দু উত্তেজনা সঞ্চার করে নিস্তেজ হয়ে গেল। বাকি জায়গায় বেড়ার পর বেড়া উঠে গেল। হয় বর্ণাশ্রমের বেড়া, নয় আচার অনুষ্ঠান বিধিনিষেধের হাঙ্গামা, নয় “আমি ঠিক আর তুমি ভুল” এই সাম্প্রদায়িকতার কোন্দল।
গীতাপ্রেসের স্বামী রামসুখদাস এই দুই সমস্যার প্রথমটাকে বিচারের আলোয় আনলেন। তিনি বললেন, বর্তমানে কারোর কাছে দীক্ষার জন্য যেও না, শুধু ভক্তিভরে ঈশ্বরের নাম করে যাও, ওতেই হবে। খুব জোরের সঙ্গে বললেন। কিন্তু বাধ সাধল আবার সেই বর্ণাশ্রমের উপর আনুগত্য। ফলে যে ডানা দুটো উড়বার জন্য খুব জোরের সঙ্গে ঝাপটালো, তারই দুটো পা শেকলে বাঁধা পড়ে থাকল।
অনেকে বর্ণাশ্রমকে অচ্ছুৎ প্রথা থেকে আলাদা করে দেখাতে যান। দেখানোই যায়। অনেক অনেক উদাহরণে রাশি রাশি ভাবোদ্দীপক গ্রন্থও লিখে ফেলা যায়। কিন্তু বাস্তবকে অস্বীকার করা যায় না। ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। আজও এ দেশের নানা প্রান্তে যা ঘটছে, ইদানীং বাংলাতেও 'নীচু জাত'-এর মন্দিরে প্রবেশ নিয়ে যা ঘটে গেল, বোঝা যায় এ সমস্যা রয়েই গেছে।
হিন্দুধর্মকে আবার জাগাতে গেলে আরেকবার সেই ভক্তি আন্দোলনের সময়ে ফিরে যেতে হবে। আরেকবার স্বামী রামানন্দ, কবীর, রবিদাস, নানক --- এনাদের পায়ের কাছে বসতে হবে। বুদ্ধ অনেক আগে এর অসত্যতা নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন। কিন্তু এনারা তো অতটা দূরের নয়।
গুরু অর্থে যিনি অন্ধকার দূর করেন। অন্ধকার ইনস্টলমেন্টে যায় না। সত্যের মজাই হল ধপ্ করে সামনে চলে এসে মিথ্যাটা দেখিয়ে দিয়ে লীন হয়ে যায়। জোর করে না, কিন্তু নিরুপায় করে তো যায়। তাই আসল গুরু সত্যের আলোতে নিরুপায় করে যান। ওতে সুখের চেয়ে দুঃখ যেমন বেশি, তেমন মিথ্যা ভানের চাইতে সত্যকারের স্বস্তিবলও তেমন বেশি। জয়গুরু।