Skip to main content

 

111.jpg

চেন্নাই সাঁতরাগাছি এসি সুপারফাস্ট ট্রেনের কামরা। শান্ত সুশীল বয়স্ক স্বামী স্ত্রী মুখোমুখি দুটো লোয়ার বার্থে বসে। ওটাই ওঁদের ন্যায্যমূল্য দিয়ে কাটা সিট। অত বয়স্ক দুজন মানুষ আর কী কী আশা করতে পারেন একটা দীর্ঘ রেলযাত্রায়? সুরক্ষা? স্বাচ্ছন্দ্য?

বাস্তবে এর কোনোটাই রেলের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয় হয় তো। আইন নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু তাকে বাস্তবায়িত করবে তো মানুষ। কিন্তু মানুষ তো শুধু বিবেচক নয়, সে চতুর, লোভী, স্বার্থদুষ্ট ইত্যাদিও বাস্তব।

চেন্নাই থেকে ট্রেন ছাড়ার পর কালো কালো পোশাকধারী উড়িষ্যাবাসী একদল মানুষ উঠল। চেহারায় বলশালী। ভাষায় অগম্য। সবাই খুরদারোডে নামবে। তারা ফিরছে শবরীমালা থেকে তীর্থ সেরে। এই সময়টা শবরীমালা মন্দির খোলে। অনেকে ব্রত নেয়। খালি পায়ে হাঁটে। নিরামিষ খায়। অনেকে একবেলা খায়। উল্লেখযোগ্য মন্দিরগুলো দর্শন করে। যেমন এরা পুরী দর্শন করে তবে নিজেদের ব্রত সমাপ্ত করবে।

চেন্নাই থেকে ছাড়ল সকাল ৮.১৫। প্রথম কয়েক ঘন্টায় প্রাতরাশ সেরে তারা যে যার বার্থ মেলে শুয়ে পড়ল। বৃদ্ধ বৃদ্ধা কুঁজো হয়ে লোয়ার বার্থে বসে। কারণ মিডল বার্থে শুয়ে চলছে উচ্চৈঃস্বরে রিল দেখা। ইতিমধ্যে তাদের সতীর্থ আরো কয়েকজন চলে এলো। তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের সঙ্গে গল্পে মশগুল। তাদের গা থেকে বিচিত্র গন্ধ, যা সুখকর না, কথা বলতে বলতে শরীরে গোপন, প্রকাশ্য সব অঙ্গ চুলকানো, হা হা করে হেসে ওঠে ইত্যাদিও চলছে। বেলা গড়ালো। আরো অনেকে চলে এলো। কেউ সিটে, কেউ মেঝেতে বসে দুপুরের খাওয়া খেয়ে নিল। আশেপাশে অনেকেই দুপুরের খাওয়ার পর বিশ্রাম নেওয়ার জন্য শুয়ে, ঘুমিয়ে। বৃদ্ধা দম্পতি খাওয়ার পর ঢুলছেন বসে বসে। শোবেন কোথায়? জায়গা কই? শেষে ছবিতে যে অবস্থায় দেখা যাচ্ছে সেই অবস্থায় বিকেল অবধি কাটালেন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হল। উৎপাত একইরকম চলছে তো চলছেই।

খুরদারোড আসবে রাত আড়াইটে। রাত দুটো নাগাদ সব সতীর্থ চলে এলো। আবার হইহই। বৃদ্ধা দুটো পা বুকের কাছে কুঁচকে নিয়ে শুয়ে। বৃদ্ধ একটু পর উঠে বসলেন। তারা তাদের সিটেই তাদের মালপত্র বিছিয়ে দিয়েছে। বৃদ্ধা আরো সরতে সরতে রাত তিনটে নাগাদ উঠে বসলেন। দুজনেই বসে। এদিকে নামার আগে তাদের মোবাইলে চলছে ভজন। যথারীতি অগম্য ভাষা। সঙ্গে চীৎকার করে আসন্ন প্ল্যাটফর্মে আগন্তুক সতীর্থদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা এও চলছে।

তারা নামল। বৃদ্ধ দম্পতি উঠে বসে আছেন। দাঁত মেজে আসলেন। সাঁতরাগাছি আসবে বেলা এগারোটায়। এতক্ষণ কী করবেন? আবার শুয়ে পড়লেন। বললেন, চলো পিঠটা টানটান করি।

দুজনেই ছটায় উঠলেন। কামরা হালকা। নিজেদের মধ্যে গল্প করছেন। কী গল্প? ক্ষোভের গল্প না, অভিযোগের গল্প না। বেড়ানোর গল্প। রামেশ্বরমের গল্প, কন্যাকুমারীর গল্প। দৈনন্দিন জীবনের গল্প। বাড়ি গিয়ে কী খাবেন? বললে কি তারা দুটো সেদ্ধভাত দেবে? নাতির গল্প। তারা কী কী বায়না করে। কীভাবে ভালোবাসে। কীভাবে মিস করে। ট্রেন ততক্ষণে বাংলার মাটিতে দৌড়াচ্ছে। দেশে, প্রতিবেশী দেশে কত কী হয়ে যাচ্ছে। কী নৃশংসভাবে মানুষ মানুষকে মারছে দল পাকিয়ে। ধর্মে, ভাষায় সংখ্যালঘুদের জীবন বিপন্ন হয়ে উঠছে। কিন্তু এই দুজন মানুষ, এতটা জীবনের পথ পেরিয়ে এ সব অসহিষ্ণুতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজেদের ছোটো সংসার বানিয়ে নিয়েছেন। জগত বদলানোর না আছে ভরসা, না আছে সময় আর হাতে। কিন্তু অপমানবোধ? হয় তো এতটা জীবন বেঁচে এসে সেটাও বড় বাহুল্য বোধ হয়। যখন এসব ঘটনা ঘটছিল তখন রেলযাত্রার শৃঙ্খলা রাখার দায়িত্বে থাকা মানুষেরা কি কিছুই দেখছিলেন না? সব তো সবার চোখের সামনেই ঘটছিল। কী করে, কী করে কামরা ভরে যাচ্ছিল অবাঞ্ছিত, অন্যায্য যাত্রীর উপস্থিতিতে সবাই দেখছিল না? সবাই দেখছিল। কিন্তু এটাই তো স্বাভাবিক। চলে আসছে। আর যা চলে আসছে তাকে প্রশ্ন করার দরকার কজন মানুষ আর অনুভব করেন? বলশালীর হাত থেকে দুর্বলকে বাঁচায় আইন। সেই আইনের রক্ষাকর্তাই যখন ওইটুকু সীমায়িত স্থানেই নিজের মর্জির মালিক, দায়িত্ববোধের নয়, তখন একটাই কামনা কী করে কতক্ষণে এ যাত্রা শেষ হবে।

মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ কি বাস্তবের করুণ নিদান জানি না। কিন্তু ইদানীং মানুষ মানুষের সম্পর্ক থেকে সরে প্রযুক্তির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে এ বাস্তব। যন্ত্র এখন মানুষ হওয়ার চেষ্টায় আর মানুষ যন্ত্র হওয়ার চেষ্টায়। দুজনে এসে যেখানে মিলবে সেখানে কে বেঁচে থাকবে? এর উত্তর আমরা হয় তো আন্দাজ করলেও করতে পারি। কিন্তু ওই বৃদ্ধ দম্পতি এর আভাসও পাননি। তাঁদের ঈশ্বর ঘরের কোণার সিংহাসন ছেড়ে যান না, আর তাদের বিশ্বাস লেপতোশক, রান্নাঘর, খাটবিছানা ছেড়ে যায় না। কে বেশি সার্থক কে বলবে?