বন্ধ দরজার ওপার থেকে কেউ সাড়া দিল না। অন্য কেউ হলে ফিরে যেত। কিন্তু রাধাদাসী ফিরবে কেন? এ বাড়ি সে আজ প্রথম এলো নাকি ভিক্ষা করতে? সঙ্গের ছুঁড়িটা, জবা, নতুন ভেক পেয়েছে। বলে, চলো, ফিরে যাই। রাধাদাসী বলল, দাঁড়া দেখি চুপ করে ছুঁড়ি। বলেই জবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুকটায় মোচড় দিল। রাধাদাসীর নিজের বয়েস ষাট পেরোলো। তার গোঁসাই এই বছর দুই হল বৈকুণ্ঠগামী হয়েছেন। কিন্তু এই অভাগীর? এ এই পঁচিশে পা দিতে বা দিতেই সব খুইয়েছে। গ্রামের শকুনগুলোর নজরও পড়েছিল। তাদের মুখ থেকে ছিনিয়েই এনেছে একরকম রাধাদাসী। নইলে এর শাশুড়ী গ্রামের কয়েকটা মাথাকে বাড়িতে ডেকে, বিধবা বউমাকে নিয়ে … এমন অধর্মের কাজ নেই সে বুড়িমাগী পারে না…..বড়বেটার বউ গলায় দড়ি দিল .. কেন? শ্বশুরের স্বভাবচরিত্র কে না জানে গ্রামে। তিন ছেলেই বাড়িতে। বাবার মুদির দোকানে শিকড় গাড়তে বসে। কার শিকড় কত গভীরে যায়, কাকে কেটে যায়। একের সঙ্গে অন্যের শেয়ালকুকুরের মত খেয়োখেয়ি লেগেই আছে। মেজোটার বউ ছিল এই জবা।
জবার হাতে একটা মুড়ির মোয়া ঝুলি থেকে বার করে দিল রাধাদাসী। বলল, তুই ওই ছায়ায় গিয়ে খা। আর ওই কলের জল খেয়ে নে।
জবা অশ্বত্থগাছটার নীচে গিয়ে বসল। রোগা শরীরটায় জ্বালা কিছু নেই। কিন্তু একটা ঝিমধরা বিষণ্ণতা আছে। সকালের জৈষ্ঠের রোদ চারদিক ফালাফালা করে দিচ্ছে। জবা বসে রাধাদাসীকে দেখছে। মোটা মানুষটার পিঠ ঘামে ভিজে একশা। এই মানুষটাকে দেখলে তার বুকে বল আসে। আগের জীবনের কথা ভাবে না। সে জীবন পচা পুকুরের গন্ধের মত রাতদিন তার নাকে লেগেই আছে। কিন্তু সে যাবে কোথায়? পালাবে কই?
রাধাদাসী বাড়ির পেছনের দিকে গেল। জবাও মোয়াটা ধীরে ধীরে চিবিয়ে গিলে, কলে গিয়ে জল খেয়ে বাড়িটার পেছনের দিকে গেল। গিয়ে দেখে রাধাদাসী জানলার রড ধরে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ভেতর থেকে এক বুড়ি বিছানায় শুয়ে শুয়ে কী বলে যাচ্ছে। রাধাদাসী জবাকে ইশারায় পাশে বসতে বলল। ঘরের ভেতর থেকে বৃদ্ধা বলল, কে রে রাধা?
রাধাদাসী গলায় একটা কৃত্রিম উদাসীনতা এনে বলল, আরেক কৃষ্ণের দাসী গো। সংসার ছাড়লে আর কার চরণে ঠাঁই হয় দিদি।
বৃদ্ধা বলল, আমার তো সে ভাগ্যিও হল না রে। ছেলে বউ চাবি দিয়ে যায় আজকাল। যে দিনে দেখাশোনা করে তার কাছে একটা চাবি আছে। সে এসে খোলে। তুই অনেকদিন পর এলি, তাই জানিস না এসব। আজকাল আর দাঁড়াতে পারি না রে।
বুড়ি কেঁদে উঠল। রাধাদাসী পাশের আমগাছটার দিকে তাকিয়ে বলল, ভালো আম হয়েছে গো দিদি। কদ্দিন পর এলাম। বছর দেড়েক তীর্থেই তো কাটালাম গো। উনি গেলেন, আমার মনও উড়তে শুরু করল।
জবার অবাক লাগল। রাগও লাগল। কী ব্যবহার এটা? রাধাদাসীর পিঠের দিকে একটা করতাল ঝুলছে। ঘাড়ের কোল ঘেঁষে দড়ি দিয়ে আরেকটা সামনের দিকে ঝুলছে। রাধাদাসী নড়লে সেটা জানলার রডে লেগে ঠুংঠুং আওয়াজ করছে।
বুড়ি বলল, তাই নাকি রে? ভালো জাতের আম। অনেক হয়েছে। বউমা ফোনে বলছিল শুনছিলাম। দেখি না রে ভালো আর। কেন যে আছি সবার উপর বোঝা হয়ে কে জানে…..বুড়ি আবার ডুকরে উঠল। শীর্ণ মুখের উপর দিয়ে কোটরে ঢোকা চোখ উপচে জলও এলো। ইতস্তত করে সে জল গড়িয়ে পড়ল বালিশে।
ওদিকে দরজা খোলার আওয়াজ এলো। একজন মাঝবয়েসী মহিলা গান গাইতে গাইতে ঢুকল। জানলার দিকে না তাকিয়েই বলল, কী গো বিছানায় হেগেমুতে রেখেছ, নাকি হয়নি?
বলতে বলতেই জানলায় চোখ পড়ল। বলল, অ্যাই….কী মতলব? চুরি? ওসব ন্যাকামি, চালাকি মারাতে এসো না…. এই সোনামণি সব জানে…কম বোষ্টুমি দেখেনি জীবনে….কাজকাম নাই রাতদিন দুটো খনখন ঠুকে হরি হরি করা আর ওদের গেলার পরার ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে…কেন রে?
জবার ভয়ে হিসি পেয়ে গেল। জবা রাধাদাসীর মুখ জানে। এখনই হুলুস্থুল একটা কিছু বাধল বলে। কিন্তু জবা ভুল ছিল। রাধাদাসী শান্ত গলায় জোড়হাতে বলল, আমরা ভিখারি, আমাদের কথা ছাড়ো। দিদির বাড়ি সেই কুড়ি বচ্ছর ধরে আসছি গো। এই সময় মানুষের আর কী লাগে? দুটো হরিনাম শোনা। পারের কাণ্ডারী তো সে-ই বলো। তোমার আমার সবার।
সোনামণি রাধাদাসীর কথায় চুপ করে গেল। ঝাঁঝ কমিয়ে বলল, তা সে সব বোষ্টুমি কি এক হয় দিদি, আমিও কি জানি না… তবে কিনা আজকাল যা দিনকাল……
রাধাদাসী বলল, সে তো বটেই দিদি…..
সোনামণিকে কেউ তোয়াজ করে কথা বলবে আর সোনামণি তাকে মুখ ঝামটা করবে এমন মেয়ে সোনামণি নয়। সে বলল, এই রোদে বাইরে কেন? আমি তো এসে গেছি। এসো, চা বসাই।
বৃদ্ধার মুখে হাসির আলো ফুটল। যেন শরতের শেষ কয়েকটা শিউলি ফোটানো বাকি ছিল ভুলে গিয়েছিল গাছটা। দুটো কুঁড়িকেই যত্ন করে ফুটিয়ে ধরল।
পাখা চলছে। সোনামণি চেয়ারে বসে। বৃদ্ধা দেওয়ালে বালিশে হেলান দিয়ে বসে। জবা আর রাধাদাসী মেঝেতে বসে। সবার হাতে চায়ের কাপ। কথা জন্মাচ্ছে। সময় জন্মাচ্ছে। স্মৃতির পর স্মৃতি জন্মাচ্ছে। হাসাচ্ছে, কাঁদাচ্ছে। বেলা গড়াচ্ছে। কার হুঁশ আছে? ব্যথা পেরিয়ে আসার সুখ নেই? দুর্ভাগ্যের পায়ে বেড়ি পরিয়ে রাস্তায় নেমে আসার সুখ নেই? আছে। বৃদ্ধার এত গল্প ছিল? রাধাদাসীর এত গল্প ছিল? জবার, সোনামণির? কোনো গল্পই নতুন কিছু নয়। সব গল্পের কেন্দ্রেই আছে পুরুষ। তবু কী এ জগত পুরুষছাড়া হোক কেউ কামনা করল? কেউ না। মানুষ হোক, বুঝুক ওরা, এতটাই চাইল। কিন্তু যেন অনেক বেশি চাইল। বেশ কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে থাকল। যা স্বাভাবিক সেই কি ভালো? জগতে অনেক অন্যায় কি দীর্ঘদিনের অভ্যাসে স্বাভাবিক, গা সওয়া হয়ে যায়নি? তবে? বদলাবে না চারপাশ? কেউ বলবে না, গা সওয়া মানেই সেটা ন্যায্য নয়?
এবার উঠতে হবে। জবার মুখের দিকে তাকিয়ে সোনামণির চোখে জল এলো। তার মাথায় হাত রেখে বলল, গোটা জীবন এমন নিজেকে ঠকিয়ে কাটিয়ে দিবি মেয়ে?
জবা কী উত্তর দেবে বুঝল না। নিজের সঙ্গে নিজে অভিনয় ছাড়া যে বাঁচা যায়, সে সম্ভাবনাও যে একটা সম্ভাবনা, এ কথা তার কাছে এতটাই নতুন, বিশ্বাস হল না। বাড়ি ছেড়ে বেরোতে তার একটা ভয়ই মনে এলো, অনেকটা রাস্তা বাকি এখনও। সে অপরাধীর মত মুখ করে সোনামণির দিকে তাকিয়ে বলল, একবার বাথরুমে যেতে দেবে গো?