জ্ঞানচর্চা কী? নাম সংকীর্তন? ভোরে উঠে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ? পুজো উপাসনা করা? অনুষ্ঠান, আচার-বিচারে ব্যস্ত থাকা? যোগাভ্যাস?
ভারতে আজকাল শঙ্করের নাম ভীষণ কম শোনা যায়। আদি শঙ্করাচার্য। নাম যদিও বা শোনা যায় তার লেখা নিয়ে চর্চা প্রায় হয় না বললেই চলে। কারণ? কঠিন। আপাতভাবে নীরস। এ অবশ্যই নতুন কিছু না। রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা গান বাদ দিলে তার প্রবন্ধ নিয়ে চর্চা যেমন নেই বললেই হয়। বিবেকানন্দের কয়েকটা প্রেক্ষাপটহীন উদ্ধৃতি বাদ দিলে গভীরভাবে পড়ার, আলোচনার অভাব চোখে পড়ার মত।
হিন্দুধর্মের আচার-বিচার নানাবিধ কুসংস্কার ইত্যাদির বাইরে যে দিকটা বিশ্বের তাবড় তাবড় প্রাজ্ঞ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল সেটা তার দর্শন। কোন দর্শন? বেদান্ত দর্শন। বিবেকানন্দ বিশ্বের কেন্দ্রের ধর্মসভায় দাঁড়িয়ে যে হিন্দুধর্মের কথা বলেছিলেন, সে কোন হিন্দুধর্ম? সে বেদান্তের সিদ্ধান্ত নির্ভর হিন্দুধর্মের কথা বলেছিলেন। সহিষ্ণুতার কথা বলেছিলেন। ত্যাগের কথা বলেছিলেন। ধর্মীয় যাবতীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে ওঠার আদর্শের কথা বলেছিলেন। সে কোন সিদ্ধান্তের উপর দাঁড়িয়ে? কেউ বলবেন, ওনার গুরু রামকৃষ্ণের শিক্ষার উপর দাঁড়িয়ে। কথাটা অর্ধসত্য। বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন রামকৃষ্ণ বেদান্তের মূর্ত রূপ। কিন্তু সিদ্ধান্তের আদি কথাটা এসেছে বেদান্ত থেকেই। তাই বিদেশে বিবেকানন্দের প্রচারিত হিন্দুধর্মের সংগঠনের নাম বেদান্ত সোসাইটি। রামকৃষ্ণ মিশন না। বিবেকানন্দের হিন্দুধর্মের ব্যাখ্যায় মানুষের কথা এসেছে বারবার। সম্প্রদায় আর সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক সত্যের কথা উচ্চারিত হয়েছে বারবার। যার ভিত্তি কী? বেদান্ত দর্শন। বিবেকানন্দ বেদান্ত থেকে বেছে বেছে সদর্থক, উদার এবং সামগ্রিকভাবে মানুষের কলাণের পথ নির্দেশকারী শিক্ষা তুলে তুলে আনছেন। এবং এই সত্যের উপরে দাঁড়িয়েই তিনি হিন্দুধর্মকে অন্যান্য ধর্মের জননীর সঙ্গে তুলনা করছেন।
“পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন সন্ন্যাসী-সমাজের পক্ষ হইতে আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জানাইতেছি। সর্বধর্মের যিনি প্রসূতি-স্বরূপ, তাঁহার নামে আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি। সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের অন্তর্গত কোটি কোটি হিন্দু নরনারীর হইয়া আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ দিতেছি।”
বিবেকানন্দের বোধে হিন্দুধর্মকে নিয়ে গৌরব এই জন্যে ছিল না যে হিন্দুধর্ম বাকি ধর্মদেরকে প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখে। বরং বিবেকানন্দের ভাষায়….
“যে ধর্ম জগৎকে চিরকাল পরমতসহিষ্ণুতা ও সর্বাধিক মত স্বীকার করার শিক্ষা দিয়া আসিতেছে, আমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমরা শুধু সকল ধর্মকেই সহ্য করিনা, সকল ধর্মকেই আমরা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করি। যে ধর্মের পবিত্র সংস্কৃত ভাষায় ইংরেজী ‘এক্সক্লুশন’ (ভাবার্থঃ বহিঃষ্হকরণ, পরিবর্জন) শব্দটি অনুবাদ করা যায় না, অমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া গর্ব অনুভব করি। যে জাতি পৃথিবীর সকল ধর্মের ও সকল জাতির নিপীড়িত ও আশ্রয়প্রার্থী জনগণকে চিরকাল আশ্রয় দিয়া আসিয়াছে, আমি সেই জাতির অর্ন্তভুক্ত বলিয়া নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি।”
বিবেকানন্দের এ বিশ্বাস তাঁর একার বিশ্বাস ছিল কী? ভারতীয় নবজাগরণ যে রামমোহনের হাত ধরে হয়েছে সেই রামমোহনের বিশ্বাসের আকরগ্রন্থ বেদান্ত ছিল না কি? রবীন্দ্রনাথ? তাঁর বিশ্বাস উপলব্ধির আকরগ্রন্থ কী ছিল? সেই বেদান্ত উপনিষদ। বিবেকানন্দের ভাষায়,
“বেদান্ত এই নিগূঢ় প্রয়োজন উপলব্ধি করিয়া এক সত্য প্রচার করেন এবং একাধিক সাধনপ্রণালী স্বীকার করেন। তুমি খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ, য়াহুদী বা হিন্দু হও না কেন, যে-কোন পুরাণ-শাস্ত্রে বিশ্বাসী হও না কেন, নাজারেথের ঈশদূত, মক্কার প্রেরিতপুরুষ মহম্মদ, ভারতের বা অন্য কোন স্থানের অবতার ও প্রত্যাদিষ্ট মহাপুরুষের প্রতি আনুগত্য স্বীকার কর না কেন, তুমি নিজেই একজন সত্যদ্রষ্টা হও না কেন, বেদান্ত এ-সম্বন্ধে কিছুই বলিবে না। বেদান্ত শুধু সেই শাশ্বত নীতি প্রচার করেন, যাহা সকল ধর্মের ভিত্তি এবং যাহার জীবন্ত উদাহরণ ও প্রকাশরূপে অবতারপুরুষ ও মুনি-ঋষিগণ যুগে যুগে আবির্ভূত হন। তাঁহাদের সংখ্যা যতই বর্ধিত হউক, তাহাতে বেদান্ত কোন আপত্তি উত্থাপন করিবে না। বেদান্ত শুধু তত্ত্বটি প্রচার করে এবং সাধনপ্রণালী তোমার উপর ছাড়িয়া দেয়। যে কোন পথ অনুসরণ কর, যে-কোন প্রত্যাদিষ্ট মহাপুরুষের অনুগামী হও — তাহাতে কিছু আসে যায় না। শুধু লক্ষ্য রাখিও সাধনপথটি যেন তোমার সংস্কার অনুযায়ী হয়, তাহা হইলেই তোমার উন্নতি নিশ্চিত।”
বিবেকানন্দের ভাষায় সব ধর্ম একটা দর্শন, পুরাণ আর কিছু অনুষ্ঠানের উপর নির্ভর করে। এক এক ধর্মের পুরাণের কাহিনী এক এক ধারার। আর সেইখানেই ভিন্নতা। একে অন্যের পুরাণকে, অনুষ্ঠানকে কুসংস্কার মানার চল। কিন্তু এর বাইরে কি আর কিছু নেই? বিবেকানন্দের বিশ্বাসে উপলব্ধি। নিজের মধ্যে আত্মার সার্বভৌমত্ব অনুভব করাই ধর্ম। বাক্য মনের অতীত যিনি তাঁকে সৃষ্টির প্রতিটা কণায় ও নিজের আত্মায় প্রত্যক্ষ করাই বেদান্তের চূড়ান্ত আদর্শ। সেখানে হিংসা কোথায়? প্রতিপক্ষ কোথায়?
“সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি ও এগুলির ভয়াবহ ফলস্বরূপ ধর্মোন্মত্ততা এই সুন্দর পৃথিবীকে বহুকাল অধিকার করিয়া রাখিয়াছে। ইহারা পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করিয়াছে, বারবার ইহাকে নরশোণিতে সিক্ত করিয়াছে, সভ্যতা ধ্বংস করিয়াছে এবং সমগ্র জাতিকে হতাশায় মগ্ন করিয়াছে। এই-সকল ভীষণ পিশাচগুলি যদি না থাকিত, তাহা হইলে মানবসমাজ আজ পূর্বাপেক্ষা অনেক উন্নত হইত। তবে ইহাদের মৃত্যুকাল উপস্থিত; এবং আমি সর্বতোভাবে আশা করি, এই ধর্ম-মহাসমিতির সন্মানার্থ আজ যে ঘন্টাধ্বনি নিনাদিত হইয়াছে, তাহাই সর্ববিধ ধর্মোন্মত্ততা, তরবারি অথবা লিখনীমুখে অনুষ্ঠিত সর্বপ্রকার নির্যাতন এবং একই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর ব্যক্তিগণের মধ্যে সর্ববিধ অসদ্ভাবের সম্পূর্ণ অবসানের বার্তা ঘোষণা করুক।”
তাই বিবেকানন্দের প্রবর্তিত হিন্দুধর্মের মূলতত্ত্ব রামে বা রামায়ণে না - বেদান্তে। রাম বা কৃষ্ণ বেদান্তের সত্যকে প্রকাশিত করেছেন বলেই তাঁরা অবতার, এই বিবেকান্দের মত। তাই বিবেকানন্দের শিক্ষায় বেদান্ত নতুনভাবে জেগে উঠে নব বেদান্তের রূপ নিল। পুরাণ আর বেদান্তের সিদ্ধান্তে সংঘাত হলে বিবেকানন্দ বেদান্তকেই বেছে নিতে বলছেন। কিন্তু এ রাস্তা কঠিন। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান হিসাবে বোঝা শক্ত, কিন্তু বিজ্ঞানপ্রসূত নানা প্রযুক্তিকে বিজ্ঞান হিসাবে মেনে নেওয়া অনেক সোজা। তাই পুরাণের কাহিনী, নিজের কাহিনীকে শ্রেষ্ঠ ভাবা, নিজের আচার অনুষ্ঠানকে উৎকর্ষতার পরিকাঠামো আর বাকিদেরগুলোকে কুসংস্কার ভাবা অনেক সোজা।
বিবেকানন্দকে এড়িয়ে হিন্দুধর্ম বুঝতে যাওয়া আর এভারেস্টের মাথায় ধানচাষের বীজ বুনতে যাওয়া একই কথা। অলীক হবে সে সব। বিবেকানন্দের উদ্ধৃতি না, গোটা প্রবন্ধ পড়তে হবে। সামগ্রিকভাবে পড়তে হবে।
“বেদান্ত সর্বত্রই বিদ্যমান, কেবল তোমাদিগকে সচেতন হইতে হইবে। পুঞ্জীকৃত অন্ধবিশ্বাস এবং কুসংস্কারগুলিই আমাদের অগ্রগতির বাধাস্বরূপ। যদি আমরা সক্ষম হই, তবে আইস, আমরা ঐ-সবগুলিকে দূরে ছুঁড়িয়া ফেলি এবং ধারণা করিতে শিখি যে, ঈশ্বর চেতনাস্বরূপ এবং তাঁহার পূজা জ্ঞান ও সত্যের মধ্য দিয়া করিতে হয়। জড়বাদী হইবার জন্য কখনও সচেষ্ট হইও না। সকল জড়কে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দাও। ঈশ্বরের কল্পনা অবশ্যই যথার্থ আধ্যাত্মিক হইবে। ঈশ্বর সম্বন্ধে বিভিন্ন ধারণাগুলি কমবেশী জড়বাদ-ঘেঁষা — এগুলিকে দূর করিতে হইবে।
…. তাহারা প্রথম হইতেই নিজের পায়ে দাঁড়াইতে শিখিবে। তাহারা বাল্যকাল হইতেই শিখিবে যে, ঈশ্বরই চেতনা এবং তাঁহার পূজা সত্য ও জ্ঞানের মধ্য দিয়া করিতে হয়। সকলকেই চেতনা-রূপে দেখিতে হয়—ইহাই আদর্শ।”