চন্দনাদিকে ফুচকার দোকানে দেখলাম।
কী বলো গো!
আর বলছি কী। শালোয়ার কামিজ! শাড়ি না! আমাকে জিজ্ঞাসা করল, এই বৃষ্টি.... কোথায় যাচ্ছিস? খাবি আয়....
গেলি?
পাগল!
বিশুদা গেলেন কতদিন হল?
কত আর হবে? এই মাস ছয়....কী সাত!
সত্যিই রে....মানুষকে চেনা....
যা বলেছ গো....মানুষ পারে কী করে!
===========
এ পাড়ায় মেয়ে বউরা ফুচকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে খায় না তা নয়। তবে সব বাড়ির বৌরা খায় না। সব বাড়ি বলতে কোন কোন বাড়ি? সে আছে। অত হিসাবের দরকার কী।
কিন্তু এ আলোচনা পাড়ায় ঝুনঝুনির আওয়াজের মত চলতে ফিরতে বাজতে লাগল কানে জিভে চোখে। এরপর কারোর কারোর চোখ ফুচকার দোকানে পড়ল বেশিক্ষণ ধরে। কাকে খুঁজল। যাকে খুঁজল তাকে মাঝে মাঝে পেল। আবার এমন আরো জায়গায় পেলো যেখানে "সব বাড়ির বউ" যায় না। যেমন রেলস্টেশানে সন্ধ্যেবেলা হাওয়া খেতে বড় পাখার তলায়। যেমন বাজারের মাঝখানে শিবমন্দিরের পাশে চায়ের দোকানে। যেমন কয়েকটা রেস্টুরেন্টে, যেখানে পরিবারের সঙ্গে গেলেও যাওয়া যায়, কিন্তু একা! যাবো না তো কক্ষনও।
চন্দনাদি কেন শাড়ি ছাড়ল? অমুক রঙের শাড়িটা! অমুক কাজ করা শাড়িটা! অমুক জাতের শাড়িটা! শাড়ি নিয়ে আলোচনা হয়। শোক হয়। হাপিত্যেশ জাগে। দীর্ঘশ্বাস পড়ে। চন্দনাদি হেঁটে যায়। কেমন যেন হাঁটা। কেমন যেন কথা। কেমন যেন তাকানো। শিস দিল? কোমর দোলালো? অমুকের দিকে তাকালো? কে আসে যায় আজকাল ওদের বাড়ি?
========
চন্দনাদির গল্প একদিন পুরোনো হল। ভুলেও যেতে শুরু করল অনেকে। কিন্তু তা বলে মেনে নিয়েছে? উঁহু, মেনে নেওয়ার প্রশ্নই নেই। কিন্তু সেই মেনে না নেওয়াটাকে মেনে নিয়ে একরকম চলছিল চন্দনাদির প্রতিবেশীদের। চন্দনাও চলছিল।
একদিন চন্দনাদি নিরুদ্দেশ হল। কেউ বলল গেছে কোনো আত্মীয়ের বাড়ি? কে আবার আত্মীয়? নিঃসন্তান দম্পতি। কার বাড়ি যাবে? পালালো? অন্য জায়গায় সংসার পাতল?
চন্দনাদি বছর দুই পর ফিরল। মাথায় সিঁদুর। সঙ্গে বেশ অল্প বয়েসী ছেলে একজন। পুরোনো বাড়ি ধোয়ামোছা হল। বাসযোগ্য হল। ছেলেটার বুলেট আছে। চন্দনাকে বসিয়ে নিয়ে যায় যখন, চারদিকে মরণ দীর্ঘশ্বাস পড়ে। চন্দনার পিঠ বুক পুড়িয়ে দেয়। চন্দনাদি ছাদে ওঠে, ছেলেটাও ওঠে। চন্দনাদি বাজারে যায়, ছেলেটাও যায়। চন্দনাদি পুজোর সময় সেজেগুজে অত বড় দুটো ট্রলি নিয়ে কোথায় গেল? পাহাড়ে? সমুদ্রে? জঙ্গলে? কোনো পুরোনো শহরে? গোয়া না মুসৌরি? উটি না কাশ্মীর! গোটা পুজোয় অঞ্জলিতে, মন্ত্রে, সব উপাচারে এ জল্পনা চলতে লাগল। এমনকি বিসর্জনের বাজনা ছাপিয়েও কেউ জিজ্ঞাসা করল, পেট করে ফিরবে নাকি গো?
চন্দনাদি ফিরল। বছর ঘুরতে না ঘুরতে একদিন ছেলেটা পালালো। চন্দনা বিছানা থেকে উঠল না। বাইরে এলো না। কাঁদল না।
=======
রাস্তায় বেরিয়েছে আজই দেখলাম। মুদির দোকানে। কী চেহারা হয়েছে মাগীর!
প্রতিবেশীদের গুমোট জীবনে আবার অল্প বাতাসের বেগ লাগল। শতজোড়া চোখ বেহিসাবি সুখের উপর লাগাম টানতে চায়। পারে না। ফোঁসে। চন্দনাদি হাসিমুখটা হারিয়ে ফেলেছে। এর ওর চোখের দৃষ্টিতে কুণ্ঠা জন্মাচ্ছে কি? হ্যাঁ মনে হয়। সোজা তাকায় না। চোখ নামিয়ে নেয়। একই শাড়ি দুদিন তিনদিনেও ছাড়ে না। সব সময় অন্যমনস্ক। একদিন তো মদন স্যাকরার চারচাকার তলায় পিষে যাচ্ছিল। চোট পেয়েছে। ডাক্তার তো সেই কথাই বলল। আরও বলল, সে নাকি পোয়াতি।
এটা হয়? কী করে হয়? সম্ভব? কী আশ্চর্য! ধর্মের কথা না হয় বাদই গেল, কিন্তু শরীর? সমাজ? কীসের এত গরম শরীরে? আগের বার হল না কেন? বিশুদাকে দেখে মনে হতে পারে সে বাবা হতে অক্ষম? হয়?
চন্দনাদিকে আজকাল মাঝে মাঝে হেলথসেন্টারে দেখা যায়। অল্পবয়সী মেয়েগুলো যারা নির্ধারিত বয়সে, সামাজিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে মা হচ্ছে, তারা এড়িয়ে যায়, হাসাহাসি করে। মাঝবয়েসীরা ভয় পায়। কেন ভয় পায় জানে না। এটুকু জানে সবটাই ফাঁকি। কিন্তু এই ফাঁকির সংসারে খাঁটি থাকার মত ভয়ংকর বিপজ্জনক আর কি আছে? চন্দনাদি খাঁটি। চরিত্রহীন, কিন্তু খাঁটি।
কিন্তু দেখবে কে? দেখাশোনার লোক তো কাউকে দেখে না। তবে কী করে কী করে লোক এলো। এক মাঝবয়েসী বিধবা বউ। কোন বন্ধু নাকি পাঠিয়েছে বড় শহর থেকে। হতে পারে। সে বউ যখন বাজারে বেরোয়, এ সে তাকে প্রশ্ন করে। সে সাধারণত উত্তর করে না। হাসে। আবার কখনও বলে, জানি না দিদি, এত কথা দিদির সঙ্গে হয় না। চুপ করে থাকেন।
সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু আসবে না সে? সে ছেলেটা? নাকি লোকটা?
উত্তর করে না। বাজারের ব্যাগ নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটে। ঘাস যেমন মুষলধারায় ঝরা বৃষ্টিকে বিনা বিকারে সহ্য করে, সেও তেমন। বিনা বিকারে হেঁটে যায়।
=======
চন্দনাদি মারা গেল মৃত সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে। লোক ভিড় করে এলো। বাড়ির মধ্যে থিকথিক করছে লোক। চোখ চতুর্দিকে ঘুরছে। খুঁজছে। খুঁড়ছে। যেন বলতে চাইছে, ও দিদি, ও কাজের দিদি, আলমারির চাবিগুলো দাও না। দেখি কী কী রেখে গেল। বন্ধ আলমারি। চন্দনাদির জীবনের সব রহস্য যেন লুকিয়ে ওতেই। উৎসুক চোখগুলোতে মৃত দুটো শরীর ডিঙিয়ে সে কী আর্তি! চিতার আগুন নিভল। মাটি পেল সদ্য জাত। কিন্তু কথার বিরাম হল কই? চন্দনাদি কথায় কথায় গড়িয়ে গেল, লাথি খেল, উলঙ্গ হল। আরো কত কী হল।
সপ্তাহান্তে একদিন কাকভোরে খবর ছড়ালো চন্দনাদির বাড়ি চুরি হয়েছে। সর্বস্ব নিয়ে গেছে চোরে। দুদিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে। রাস্তাঘাটে জল দাঁড়িয়ে। কাদায় কাদা। তাও ছুটল প্রতিবেশীর দল। শিকারীর দল।
কারেন্ট নেই। তায় মেঘের অন্ধকার। কী দেখবে? গোটা বাড়ি লণ্ডভণ্ড। শাড়িগুলো এদিক ওদিক ছড়িয়ে। ছবির ফ্রেম থেকে ছবি ছিটকে মেঝেতে পড়ে। যে দরজা ভেঙে চোর ঢুকেছিল সে দরজা দিয়ে কয়েকটা কুকুর এসে আশ্রয় নিয়েছিল এই দুর্যোগে। হঠাৎ এত লোকের এমন নিঃশব্দ হানাতে তারা প্রথমে ঘাবড়ে গেল। তারপর পরিত্রাহি চীৎকার শুরু করে দিল। একে ওকে তাড়া করতেও শুরু করল।
ফাঁকা আলমারি, ফাঁকা ঘর, দালান, রান্নাঘর, বাথরুম….কী দেখবে? কী খুঁজবে আর? ওদিকে আরো কালো করে মেঘ করছে। প্রতিবেশীরা ফিরে যাচ্ছে। কারোর কারোর হাতে বাগানের জবার ডাল, গোলাপের ডাল, শাকের ঝাড়। কারোর হাতে চিরুনি, মাথার কাঁটা, গায়ে সাবান ঘষার ছোবড়া, আয়না। পুরোনো শাড়িও কেউ নিয়েছে, বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাচ্ছে সেই দিয়ে। ওদিকে কুকুরগুলো ডাক থামিয়েছে। এ ঘর, সে ঘর ঘুমিয়ে পড়েছে অঘোরে। কোনো ভয় নেই, বিপদ নেই যেন সংসারে।
আলমারির মাথায় রাখা একটা পুরোনো ছবি, চন্দনাদির, আচমকা জোলো হাওয়ায় উড়তে শুরু করল। এ ঘর ও ঘর উড়ে বসার জায়গা খুঁজল যেন। পেল না। ভাঙা দরজা দিয়ে উড়ে গেল মেঘলা আকাশের দিকে। প্রবল বর্ষণে নামিয়ে মুখ থুবড়ে ফেলল কাদায়। গ্রামে তখন আসন্ন দুর্গোৎসব। কাশের বীজ বুনছে প্রকৃতি, লুকিয়ে। কালো মেঘ সরিয়ে সাদার বাহারে চমকে দেবে সবাইকে। যেমন চন্দনাদি ভেবেছিল।