চৈতন্য মহাপ্রভু এসেছিলেন তিরুচেরাপল্লীতে। চারমাস ছিলেন। এ কথা আছে চৈতন্য চরিতামৃতে। তিরুচেরাপল্লীতে শ্রীরঙ্গমস্বামী মন্দির বা রঙ্গনাথাস্বামী মন্দিরের সামনেই চৈতন্য মহাপ্রভুর পদচিহ্ন অঙ্কিত মন্দির দেখে আনন্দিত হলাম। এদিকে বাঙালি পর্যটক তেমন আসেন না। আসে পাশে বাঙলায় কথা হচ্ছে না এমন ভারতীয় পর্যটনক্ষেত্র দুর্লভ। সেখানে এখানের স্থানীয় মানুষ এসে মহাপ্রভুর মন্দিরের সামনে দাঁড়াচ্ছেন, প্রণাম করছেন, দেখতে ভালো লাগছে।
ঠিক তার পাশেই পেরিয়ারের মূর্তি। যার গায়ে তামিল ভাষায় খোদাই করে লেখা আছে, ঈশ্বর নেই নেই নেই। গুগুল লেন্সের সৌজন্যে এখন যে কোনো ভাষায় যা কিছু পড়া যায়।
ঈশ্বর আছেন কি নেই এ বিতর্ক কোনোদিন থামবে না। কারণ যদি কোনোদিন এর সিদ্ধান্ত হয়ে যায় তবে সেইদিন হবে চূড়ান্ত শূন্যতার দিন। আমীর খাঁ এর মারোয়া রাগের রহস্য যদি কোনোদিন AI ধরে ফেলে সেদিনই ভারতীয় রাগসঙ্গীত তথা সব ভাব মাধুর্যহারা হয়ে যাবে মানুষের হৃদয়ে। সুতরাং তর্ক থাক। নেই আর আছে এ নিয়ে কথা হোক। অবশেষে জেগে থাকবে শুধুই মানুষ। যার চিত্তই হ্যাঁ আর না এর উৎস।
তবে কথা হবে এই যে ধর্মের নামে এত হানাহানি। কথাটা সত্য। তবে গোটা সত্য নয়। মত যেখানে শেষ কথা সেখানে অনুভব ব্রাত্য। আর যেখানে অনুভব ব্রাত্য সেখানে সব কিছুই আবর্জনা। চৈতন্য দেবের সময় শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতের অভাব ছিল না। না তো ছিল সুকৌশলী ব্যাখ্যাকার টীকাকারের অভাব। কিন্তু অনুভব ছিল না। মহাপ্রভু সেই স্রোতের ধারা আনলেন প্রবল বেগে। চৈতন্যদেবের হৃদয়ের কাছাকাছি হয় তো সব চাইতে বেশি গেছেন রামানন্দ। আমি চৈতন্য বিশেষজ্ঞ নই। গবেষক তো নই। কিন্তু চরিতামৃতে রামানন্দ আর মহাপ্রভুর মধ্যে পদাবলী নিয়ে আলোচনা বিহ্বল করে। আস্পর্ধায় এক এক সময় ভাবি যদি রবীন্দ্রনাথ পাশে বসতেন? জ্ঞানী পাঠক আমার এ ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন। তাঁরা শুষ্ক তর্ক করতেন না। মানুষের কীসে আত্যন্তিক মঙ্গল হবে সে আলোচনাও করতেন না। কী সে মানুষ সব অমঙ্গল থেকে নিজেকে রক্ষা করবেন সে ভাবনা ভেবেছেন। তাই হৃদয়কে চালক করতে চেয়েছেন হৃদয়ের রাজাকে অন্বেষণ করে। যে কিশোর। যে প্রেমিক। যে রাখাল। যে নীতিবিশেষজ্ঞ নয়। যে আশ্রয়।
যখন মন্দির থেকে বেরোচ্ছি এক বৃদ্ধা নত হয়ে প্রণাম করছেন। তারপর ধীর পায়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে পেরিয়ার আর মহাপ্রভুর সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছেন। চোখের দিকে তাকালে বোঝা যায় হয় তো আর কোনো স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার মত অজ্ঞতা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। জীবনের গভীরে যে শূন্যতা তার কেন্দ্রে একটা যেন ঘন্টা বসিয়েছেন। সেই ঘন্টায় এক একবার ঘা দিয়ে যেন বলে চলেছেন, তবু আমি আছি....আছি। অন্তত মৃত্যুর আগে অবধি আমি আছি। পেরিয়ার আর মহাপ্রভু দুজনেই জানেন মানুষের তর্ক পেরিয়ে একজন বোকা মানুষ বেঁচে থাকে। হৃদয় আঁকড়ে। তার গতিবিধি বোঝে কার সাধ্যি? তা কোনো মতের হ্যাঁ বা না-তে কিছু আসে যায় না, কিন্তু তার যেখানে দরদ সেখানে হাত পড়লে সে পাগল হয়ে যায়। তাই ভক্তি আন্দোলনের সময় বেণারসের এক ভক্ত কবি যখন বললেন সব ধর্মের মূল দরদ আর অধর্মের মূল অহং - তখন আমার গোটা সত্তা সে কথায় সায় দিয়ে বলল, হ্যাঁ। অহং এর গায়ে কোনো এক মতের পোশাক যখন তার পরিচয় হয়ে গিয়ে সেঁটিয়ে বসে যায়, তখন সে ভুলেই যায় তার সব মতামতের ঊর্ধ্বে সে একজন অতি সাধারণ মানুষ। যার থাকা না থাকায় এ বিশ্বসংসারের কিচ্ছুটি আসে যায় না। সে দিনশেষে এক অবোধ জীবমাত্র, যে তার বুদ্ধি দিয়ে সব বুঝে নিতে চেয়েছিল আর হৃদয় দিয়ে পূর্ণতা অনুভব করতে চেয়েছিল। কোনোদিন পারেনি। পারবেও না।