Skip to main content

 

 

বললাম, গোঁসাইকে ভেতরে গিয়ে বলো, আমার অশৌচ, আশ্রমে ঢুকতে নেই এখন।

সেবক গেল। ফিরে এলো। বলল, গোঁসাই ডাকছেন।

ডাকছেন? এখন? আশ্রমের ভেতরে? এই অবস্থায়?

পা চলতে শুরু করল দ্বিধা নিয়ে। কোথায় উনি?

মন্দিরে।

তুমি যাও ভাই। ওঁকে গিয়ে বলো এই যে আমি বাইরে দাঁড়িয়ে। উনি এসে দেখা দিন। আমি দূর থেকে প্রণাম করেই চলে যাব। আমার স্পর্শ এখন অশুচি।

সেবক বলল, আদেশ, আপনাকে মন্দিরের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার।

কী করে? যাই কী করে?

তবু এক পা, এক পা করে উঠতে শুরু করলাম। চারদিকে তাকাতে ভয়। কেউ কি কিছু ভাবছে? নিন্দা করছে? এ কী ছেলেমানুষী তোমার গোঁসাই?

মন্দিরের ভেতরে অন্ধকার। ঢুকেই চোখ শুধু অন্ধকারের দেওয়াল দেখল। দৃষ্টি ঠিক হতে সময় লাগল। ওই তো উনি। বসে। আমার দিকে তাকিয়ে। রাধাগোবিন্দের সামনে জ্বলছে মাটির প্রদীপ।

চোখে জল এলো। গাল গড়িয়ে নামলও বুঝি এক বিন্দু। গোঁসাই হাসল। হাত বাড়িয়ে গাইল, “পথ যদি আর না যায় দেখা তোমার আমি হব একা, দিশাহারা সেই অকূলে….আমায় মুক্তি যদি দাও বাঁধন খুলে।”

গোঁসাই পাশে ডাকল। বসলাম। গোঁসাই বলল এখনই তো আমার কাছে আসার সময় গো। গায়ে যখন প্রিয়জনের দাহের শ্মশানের গন্ধ তখনই তো প্রভুর অঙ্গের চন্দনের গন্ধের সান্ত্বনা। এসো ভাই।

বললাম, সে আমার সত্তার সত্য, না আমার জীবনের পথের কান্ডারি? যদি কান্ডারি তবে এমন নিঃস্ব করা কেন? আর যদি সে সত্তার সত্যই হবে তবে আমাকে নিজের মধ্যে ডুবিয়েই নেয় না কেন? এত সহ্য হয়!

গোঁসাইয়ের চোখের জলে জল। বলল, সে দুই ভাই। সেই তোমার অস্তিত্বের সত্য, সেই তোমার নিত্য জীবনের নিত্য কান্ডারি।

তবে আমি?

গোঁসাই বলল, গভীর ঘুমে যে জেগে থাকে সে কি তুমি?

না গোঁসাই।

সে তোমা ছাড়া কিছু?

তাও না গোঁসাই।

গভীর ঘুমে তোমাকে ঘিরে তোমাকে ছাপিয়ে তোমারই চেতনায় যে, তাকেই জাগায় পেলে বুঝবে সে-ই তোমার অঙ্গে অঙ্গে, আবার তুমিও তার অঙ্গে অঙ্গে। তোমার অস্তিত্বের সত্য হয়ে সে শিব, তাই শুভ না হয়ে মানুষের স্বস্তি নেই আর তোমার জীবনের কান্ডারি হয়ে সে মা, তাই সমর্পণ না করে প্রাণীর মুক্তি নেই।

আর তোমার শ্রী রাধাগোবিন্দ?

একই গো। ব্রহ্ম হয়ে স্থির, লীলাময় হয়ে গোপীমোহন, রাধারমণ।

একজন এসে বলল, গোঁসাই আরতির জোগাড় দেরি হয় যে। তুমি কথা বলো, আমি গোছাই।

গোঁসাই মুখ তুলে বলল, তাই তো ….. তুমি এক কাজ করো…. একে দুটো প্রসাদ এনে দাও… মুখটা বড্ড শুকনো লাগছে……

এ সুর, এ দরদ কোন প্রাণে জাগে গোঁসাই? আবার চোখ ভিজল। খিদের খবর যে জানে সেই তো দরদী গোঁসাই।

প্রসাদ কক্ষে ডাক পড়ল। গেলাম। ফিরে এলাম যখন আরতি শুরু হয়ে গেছে। আরতির মাঝে গোঁসাই আমার সামনে আরতির পঞ্চপ্রদীপ এনে দাঁড়ালো। উষ্ণ তাপ মাথায়, কপালে ছুঁইয়ে বললেন, ব্যথায় জেগে থাকো, সব বুঝবে।