Skip to main content

 

একদিন খিলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছিল। যদিও এই নিয়ে মতানৈক্য আছে ঐতিহাসিকদের মধ্যে। খিলাফত আন্দোলনের পর রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র দুটি প্রবন্ধ লেখেন, যার বিষয় ছিল হিন্দু মুসলমান ঐক্য। শরৎবাবু ভীষণ কঠিনভাবেই বলেন এ ঐক্য সম্ভব নয়, এবং মহাত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধশীল হয়েও তাঁর খেলাফত আন্দোলনকে সমর্থন জানানোকে মেনে নেন না। রবীন্দ্রনাথ বলেন হিন্দু মুসলমান এর প্রভেদ শুধু নেই অনেকাংশে বিরোধ আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি মানবিকতার খাতিরে মিলনের রাস্তার আলো খোঁজার পথ খোঁজেন।

খিলাফত আন্দোলন আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে ঘটেছিল। সেদিনে হিন্দু মুসলমানের সৌহার্দ্য আর আজকের সৌহার্দ্যর মধ্যে কী পার্থক্য সে নিয়ে আলোচনা করার মত পাণ্ডিত্য বা তথ্য আমার নেই। কিন্তু এতটা তো অবশ্যই সত্য যে পাশাপাশি অবস্থান করেও শতাব্দীর পর শতাব্দী সহজ হয়নি অনেক কিছুই। কেন হয়নি, কী তার উপায়, সে নিয়ে এত বড় বড় মহাত্মারা ব্যর্থ হলেন যখন সেখানে চিন্তার নিশ্চয়ই কিছু আছে। কয়েকটা বিজ্ঞাপন, সিনেমায় যে আবেগপূর্ণ মিল দেখানোর প্রয়াস পাওয়া যায় যা কতকাংশে বাস্তব প্রশ্নের।

একটা পার্থক্যের মূল অবশ্যই উৎস। হিন্দুধর্মের উপনিষদ, পুরাণ, গীতিকাব্য জুড়ে এ দেশের আসমুদ্রহিমাচল মিশে আছে। হিমালয় থেকে শুরু করে কন্যাকুমারী অবধি তার ধর্মে, দর্শনে মিশে। কিন্তু ইসলামে তা সম্ভব নয়। কারণ তার উৎস অন্য স্থান। সে ধর্মের সৃষ্টির ইতিহাস অন্য জাতের। তার পবিত্রতম স্থান ভারতের বাইরে। এ এক। তাছাড়া ইতিহাসের আরো অনেক কালো অধ্যায় আছে যা সংঘাতে, ধ্বংসের বিবরণে এমনই আকীর্ণ যে সেও মিলনের এক বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে। এর উপর বর্তমানযুগের নানা ঘটনায় জন্মানো ইসলামোফোবিয়া তো আছেই। দিন যত এগোচ্ছে বিশ্বজুড়ে এ ইসলামোফোবিয়ার পার্থক্যটাই যেন চওড়া হচ্ছে। সেটা ভাবার।

কিন্তু আমার যে কথা বারবার মনে হয়, এ পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ভারতের পক্ষে সেক্যুলার মনোভাবাপন্ন থাকাই স্বাস্থ্যের। তার কারণ হিন্দু যদি সেক্যুলার না হয় তবে হিন্দুর সমস্যা সব চাইতে বেশি। তার কিছু কারণ আমার মনে হয়। তাই এই লেখা।

হিন্দুর ধর্ম তার আচার অনুষ্ঠান নির্ভর। সেই আচার অনুষ্ঠানে যেমন বিস্তর ফারাক হিন্দুতে হিন্দুতে তেমন অন্য ধর্মে দেখা যায় না। হিন্দুধর্মের বহু প্রধান পুরুষেরা ঘোষণা করে গেছেন যে হিন্দুধর্মের প্রাণ তার বর্ণাশ্রম প্রথায়।

এখন সুক্ষ্মবিচারে বর্ণাশ্রম মানেই অচ্ছুৎ প্রথা নয়। কিন্তু বাস্তবে দুই-ই এক। হিন্দুধর্মের মধ্যে এই বিভেদের, অস্পৃশ্যতার প্রাচীর এমন সুদৃঢ় হয়ে শিকড় চারিয়ে আছে যে ধর্মের শিকড়ে জল পেলেই তারও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা।

বর্ণাশ্রম আর অস্পৃশ্যতা নিয়ে অনেক আলোচনা, অনেক পরিসংখ্যান, অনেক অনেক নৃশংস ঘটনার রিপোর্টিং আজও ঘটে চলেছে, এ বাস্তব।

এরপর আছে হিন্দুর মত, পথ আর বিশ্বাসের পার্থক্য। গীতাকে সমন্বয় গ্রন্থ কেন বলে? কারণ সে সেই সময়ের নানা মতের মধ্যে একটা সমন্বয় করতে চেয়েছিল বলে। বিশেষ করে বৌদ্ধমতের সঙ্গেও। সেদিনের গীতা থেকে আজকের রামকৃষ্ণ পরমহংস অবধি হিন্দুধর্মের নানা দিকের মধ্যে সমন্বয় সাধনেই কাটিয়েছেন। এর মধ্যে শিখমত জন্মেছে। লালন, শিরডি সাঁই এসেছেন। বেশ কয়েকজন মরমী সুফি সাধক এসেছেন। কিছু কিছু হিন্দু তাদেরকেও পরমেশ্বরের এক এক মত বলে মেনে নিয়ে দরগায় আজও নির্দ্বন্দ্বে যান, নিজের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। শেষোক্ত মানুষজন হিন্দু মুসলমানের মধ্যে আত্মিক যোগের পথ খুঁজেছেন ভালোবাসায়, মানবিকতায়, সহমর্মিতায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এদের দর্শনের অনুগামীর সংখা ভীষণ কম।

দলিত, মতুয়া, হরিজন যাই বলি না কেন এরা হিন্দু সমাজে অমানবিক অত্যাচারিত হয়েছে। অনেকে ধর্মান্তরণের পথ বেছে নিয়েছেন। আম্বেদকর হিন্দুধর্মে নিজের অত্যন্ত কষ্টার্জিত শিক্ষার জোরেও নিজের জায়গা করতে না পেরে বৌদ্ধধর্মকে বেছে নিয়েছেন। এবং বহু দলিতকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করেছেন।

হিন্দুধর্মে বর্ণাশ্রম আর অস্পৃশ্যতাকে ভাঙার চেষ্টা হয়নি তা নয়, কিন্তু তাকে রাখার চেষ্টা এত বেশি হয়েছে যে তাকে ভাঙার চেষ্টা পিছিয়ে গেছে। অবশেষে রাজনৈতিক ক্ষমতার বলে, পদমর্যাদার বলে, অর্থনৈতিক বলে অনেকে নিজেকে রক্ষা করার পথ খুঁজেছে। কিন্তু তাদের সংখ্যাই বা কত?

হিন্দুর আচারবিচার, খাদ্যাভ্যাস, অনুষ্ঠানেপার্বণে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ে, ভিন্ন ভিন্ন জটিল ধর্মীয় তত্ত্বে এত এতভাবে শতধা বিভক্ত হয়ে আছে যে একে এক জায়গায় আনা অসম্ভব। ইদানীং আমিষ, নিরামিষ আর শংকরাচার্য নিয়ে যে সব সমস্যা দেখা দিয়েছে এসব তারই উদাহরণ।

হিন্দুধর্ম আসলে বিকেন্দ্রিত ধর্ম। বেদান্তকে মূল মুখে বললেও তার এত এত সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা আজ হয়েছে যে মূলে ফেরা অর্থে গঙ্গাকে গঙ্গোত্রীতে নিয়ে যাওয়ার সামিল। একদিন রামমোহন প্রমুখ এ কাজটা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হয়নি যে সে ইতিহাসই সাক্ষী। তারা এক ভিন্নধর্মেরই প্রবর্তনা করেন।

হিন্দুধর্মের একান্ত মিলনক্ষেত্র তাই সেক্যুলারইজমেই। হিন্দুর এই বৈচিত্র্যময় বিশ্বাস, তত্ত্ব, আচার অনুষ্ঠান ইত্যাদি কোনো তত্ত্বে যদি দাঁড়ায় তা সেক্যুলারিজমের ভারতীয় ব্যাখ্যায়। যা আসলে প্লুরালিজমের একটি রূপ।

এ লেখা শেষ করি শ্রীরামকৃষ্ণের বলা গল্পের উদাহরণ দিয়ে। একজন একটা গাছে এক গিরগিটি দেখে এলো। এসে বলল, এক প্রাণী দেখলাম যার রং লাল। অন্যজন বলল, আমিও দেখেছি, তার রং আসলে সবুজ। কেউ বলল, নীল। এই নিয়ে তর্ক বেধে গেল। তখন তারা সবাই গিয়ে ধরল গাছের নীচে যে অহর্নিশি বসে থাকে, তাকে। সে বলল, আরে ভাই তোমরা সবাই সত্য। এ প্রাণীর নাম গিরগিটি।

বেদান্তে ব্রহ্মের আরেক নাম নির্বিশেষ। এ সত্য একান্ত ভারতীয় সত্য। সারা পৃথিবীতে যেমন নানা বিষয়ে গবেষণা হয়েছে। ভারতে তেমনই গবেষণা হয়েছে ধর্ম নিয়ে। রামকৃষ্ণ পরমহংস তাই এই মাটিতেই জন্মায়। লালন, শিরডির সাঁইও। ভারতের ধর্মকে বুঝতে তাই বাইরের মানুষের এত অসুবিধা হয়। ইসলাম বা খ্রিস্টান যখন বলে আমার ধর্মই একমাত্র সত্যি, আমার ধর্মপ্রণেতাই একমাত্র ঈশ্বরের সন্তান বাকি সব মিথ্যা, তখন ভারতীয় মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষির বলে, সে কথা সত্য নয়। রামকৃষ্ণ ভারতীয় সাধনায় কোনো ব্যতক্রিম নয়, অভিব্যক্তির ধারার এক পরিপূর্ণ পরিণতি। আর ওই গাছের নীচে বসে থাকা মানুষটা ভারতের সেক্যুলারাইজম। যে ভারতীয় সেক্যুলারাজিম ঈশ্বরতত্ত্বহীন সাংখ্যকে, চার্বাককে পাশাপাশি রাখে বেদান্তের। বুদ্ধগয়াকে রাখে গয়ার থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে সংঘাতহীন। অথচ দুই দর্শন একে অন্যের বিপরীত কথা বলে। স্বামী বিবেকানন্দের উদ্ধৃতির যদি চেরি পিকিং না করি, যদি গোটা মানুষটাকে পড়তে যাই, বুঝতে যাই, তবে বুঝতে পারব দক্ষিণেশ্বরের সেই ঠাকুরের পায়ের কাছে বসে যে শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন সে ক্ষুদ্রমতের নয়। তাই চিঠিতে লিখতে পারেন, গোটা বিশ্বমানবের কাছে বিশ্বস্ত হও, কোনো সম্প্রদায়ের কাছে নয়। তার জীবনী লিখতে গিয়ে রোমা রোঁলা তাই লেখেন, গসপেল অব ম্যানকাইণ্ড।

আমাদের বাঁচার পথ এই উদারতায়। এত যুগ ধরে টিকে আছি এই সত্যকে রক্ষা করেছি বলেই। অন্যের রাস্তা নকল না করলে যারা আমাদের কাপুরুষ বলে, তাদের দুর্ভাগ্য তারা আমাদের প্রাণের গভীরে ডুবে দেখেনি, কী শক্তিতে একজন রামকৃষ্ণ আর বিবেকানন্দ ওই পরাধীন দেশে জন্মায়?