Skip to main content

 

জ্ঞান উন্মেষের প্রথম লগ্নে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের যে চোখে দেখতাম, মহিলাদের দেখতাম না। পুরুষেরা উপার্জন করে বলে শুধু না, তারা আদর্শের কথা বলে। তারা যখন আলোচনা করে তখন রাজনীতির আদর্শ, খেলার আদর্শ, সাহিত্য, ধর্মের আদর্শ ইত্যাদি কত বিষয়ে তারা কথা বলেন। সব যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মনে হত এদের এত জ্ঞান এত স্পষ্ট বলে আছে বলেই সমাজ টিকে আছে। সমাজ বলতে তখন স্পষ্ট কোনো ধারণা না থাকলেও আমার পরিবারের বাইরে যে একটা বড় কিছু আছে এ বোধ তো তৈরি হয়েই গিয়েছিল। ওদিকে রান্নাঘরে, শোয়ারঘরে মহিলা আত্মীয়, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যা গল্প হচ্ছে তার অনেকটাই ধরাছোঁয়ার মধ্যে। তাদের হাসি, কান্না, অভিযোগ, গুণগান ইত্যাদি কিছু সময়ে ধোঁয়াশা লাগলেও অগম্য যে তা বোধ হত না। পুরুষদের সমীহ করে চলতাম, মহিলাদের আদর, যত্ন, প্রশ্রয়ের আকাঙ্খায় তাদের সান্নিধ্যে ঘুরঘুর করতাম।

এ ভুল ভাঙল কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনের দোরগোড়ায়। বুঝলাম আসল খাঁটি আদর্শ বলে কিছু জগতে কোথাও থেকে থাকলেও সে বস্তু ব্রহ্মের মত দুর্লভ। আদর্শ কথাটাই একটা ভেক। দুর্বলের ঢাল। অস্বচ্ছ, অপরিণত, ভীরু চিত্তের মিথ্যা আত্মগৌরব। তারা যা বলে তা তারা যে বিশ্বাস করে না, এবং শুধু তাই নয় বড় বড় কথাকে কীভাবে ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করা যায়, কখনো অস্ত্র হিসাবে, কখনো ঢাল হিসাবে, দেখে দেখে নিত্য মোহভঙ্গ হতে লাগল। বুঝলাম তাদের উপার্জন ক্ষমতার বাইরে কোনো ক্ষমতায় তারা আলাদা মানুষ নয়, যতই উচ্চ আদর্শের আলোচনায় নিজেকে সাজিয়ে রাখুক। সে বাইরের জিনিস। সহজ অকপট বুদ্ধিতে জাগা সত্য জিনিস নয়। দিনে দিনে এও দেখলাম উপার্জনকারী গৃহিণী আর উপার্জনহীন গৃহিণীর উপর ন্যায়-নীতি বিচারের তুলাদণ্ড এক নয়। এর ব্যতিক্রম দেখিনি যে তা নয়। কিন্তু সেটা ব্যতিক্রম হিসাবেই সত্য, ক্রম হিসাবে নয়।

আজ দেশের কোণায় কোণায় আদর্শবাদীদের চোখ রাঙানি বার্তা শুনছি। কোনো জিনিসের ইতিহাস আছে বলেই কি সে সত্য? কোনো জিনিস শতাব্দী প্রাচীন বলেই কি তা অভ্রান্ত? কোনো জিনিস বহুলোকে, বহুদিন ধরে মেনে এসেছে বলেই কি তা মঙ্গলময়?

এর উত্তর আমরা সবাই জানি। মানুষের চিত্ত নিশ্চিন্ত হতে চায়। নোঙর ফেলে একটা অবিনশ্বর, নিরাপদ আস্তানা চায়। এ সত্য। শুধু এই সত্যের জোরেই উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর “হ্যাঁ” এর দিকে যায়। কারণ যার প্রাচীনত্ব আছে, যা বহু মানুষ বহুকাল ধরে মেনে এসেছে তার মধ্যে একটা নিরাপদ অবিনশ্বর অভ্রান্ত সত্য আছেই, এটা বিশ্বাস করাটা অমরত্ব পিপাসু ভীরু চিত্তের চিরন্তন বাসনা। তাই চোখকান বন্ধ করে সেই আস্তানায় পাকাপাকি একটা বাসা করে নিতে পারলেই ভাবে কিছু একটা হল।

এর বিপরীতে আরেক দলের আদর্শ হচ্ছে সব কিছুকে “না” বলে বলে একমাত্র নিজেকেই “হ্যাঁ” বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা। তারা বিদ্রুপ করে, ব্যঙ্গ করে, যা বুদ্ধি নির্ভর নয়, বিশ্বাস নির্ভর, তাকে বুদ্ধির নখে আঁচড়ে ছিন্নভিন্ন করে ভাবে বিরাট একটা সত্যের উদঘাটন করল। ভুল। সে শুধু নিজের ক্ষুদ্র সংকীর্ণ অদরদী বোধের বিজ্ঞাপন করল মাত্র।

এই দুইয়ের মধ্যে দাঁড়াবার জায়গা কোথায়? সাধারণ বুদ্ধিতে, সহজ বুদ্ধিতে, যা নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট স্বচ্ছরূপে দেখিয়ে আত্মরক্ষায় সাহায্য করে। একজন মানুষ যখন নিজের সীমাবদ্ধতাকে প্রত্যক্ষ করে তখন সে সত্যকারের নম্রতায় এসে দাঁড়ায়। পক্ষপাতহীন সহজ বুদ্ধিতে আসল নকল চিনতে পারে। মানুষের চিন্তাবুদ্ধির নির্বিচার একদিকে ঝোঁকের চেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক আর কী আছে? যাকে biasness বলে, সেটা থেকে মুক্ত হতে পারলেই তাকে আর কোনো আদর্শ, কোনো কুসংস্কারের হাতে নিজেকে সঁপে দিতে হয় না। সহজ বুদ্ধিতে কোনটা কর্তব্য স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু সমস্যা হল আমি এ রাস্তায় চলতে চাইলেও ক্ষমতাশালী অথোরিটির লোকেরা কি আমায় চলতে দেবে? তাই ব্যাপারটা শেষে ক্ষমতার হাতে গিয়েই দাঁড়ায়। গৌরবছটার প্রতি শ্রদ্ধা উপচে পড়ে। সত্য বিনা আবরণে, বিনা আভরণ ধুলোয় লুটিয়ে থাকে।