Skip to main content

 

009.jpg

 

এক সময় সে কী করে যেন বুঝে গেল, এইবার তাকে নেমে যেতে হবে। তখন ভোরের আলো সবে মাত্র ফুটতে শুরু করেছে। যেন পৃথিবীর উপর একটা বাটি উপুড় করা ছিল। কেউ সেটা ধীরে ধীরে তুলে নিচ্ছে। আলো নামছে পৃথিবীর মাটিতে। আকাশের আলো। পৃথিবীর নিজস্ব তো কোনো আলো নেই। যেমন এই শরীরটা। এর নিজের আলো কই? বুকের মধ্যে একজন প্রদীপ হয়ে বসে আছে। সেই শিখাতেই তো এই চেতনা।

নৌকা ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে ভিড়ছে। অন্য যাত্রীরা ঘুমিয়ে। মাঝিও যেন আধজাগা। নৌকা তীরে লাগল। অল্প দুলুনি হল। কেউ জাগল না। যে জাগার সেই শুধু জেগে বসেছিল মাঝরাত থেকে। সে নামল। আর নামতেই হঠাৎ একটা বড় ঢেউ আচমকা কোথা থেকে এসে নৌকাটাকে ঠেলে দিল আবার মাঝনদীতে।

সে হাঁটছে। তার আগেপিছে কেউ হাঁটছে না। কে হাঁটবে, তার যে কেউ নেই। আগে ছিল।

তার সামনের রাস্তাটা ঘন জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে গেছে। ভোরের আলো সেখান অবধি পৌঁছাচ্ছে না। তাই রাস্তা বেশ অন্ধকার। সে হেঁটে চলেছে। আর থেকে থেকেই বলছে, জয় মা তারা…জয় মা তারা।

এতদিন সে কাশীতে ছিল। শরীর হেঁটেছে। মন নানা সাধনে বেগার খেটেছে। কিন্তু ভেতরটা যেমন খাঁ খাঁ, তেমনই রয়ে গেছে। তখন একদিন কেউ বলল, এই জঙ্গলের মধ্যে একজন আছেন। মা তারার সাধক। মা তারার ছেলে। তার কাছে আসতে। জ্বালিয়ে দিয়ে জ্বালা মেটাবে।

মেঘ ডেকে উঠল। দেখতে দেখতে আরো অন্ধকার হয়ে গেল চারদিক। গাছের মাথাগুলো দুলে দুলে উঠতে শুরু করল। সে দাঁড়াতে গিয়েও দাঁড়ালো না। ঝড় উঠল। বৃষ্টি চলে এলো। সে হেঁটে যাচ্ছে। যত হাঁটছে মন বলছে, এই এই, এতদিনে ঠিক জায়গায় এসেছ। আচমকা কাঁধে একটা পেঁচা এসে বসল। সাদা পেঁচা। কিন্তু এ তো দিনের বেলা। এখন ওরা দেখে কী করে? তবে? কানের কাছে এসে পেঁচা বলল, এখানে বারোমাস অমাবস্যা। বারোমাস গভীর রাত। তবে তোমরা যাকে রাতদিন বলো, এ সে নয়। এই বলে পেঁচা উড়ে গেল। উড়ে যেতে যেতে বলল, এই যে এইদিকে, এসো, এইদিকে।

পায়ে কী ঠেকল? মানুষের হাড়। এ কী! চারদিকে মানুষের হাড়গোড় খুলি ছড়ানো। সে ধীরে ধীরে সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে এগোলো। যত এগোয় বাতাসের ঘূর্ণী তত বাড়ে। বৃষ্টির দাপট কী! যেন চামড়া ফুঁড়ে শরীরে ঢুকছে। থমকে দাঁড়ালো। কে ও? কার কান্নার আওয়াজ? এ কী শ্মশান? কেউ কি এলো দাহ করতে? এ কি স্বজন হারানোর কান্না?

একটা ছোটো মন্দির। তার সামনে উপুড় হয়ে একজন কাঁদছে। বলছে, আয় আয়, মা আয়, আর বলব না ওসব…আয় আয়।

সে থমকে দাঁড়িয়ে। কে এ পাগল? এমন কান্না তো আগে শোনেনি কোনোদিন। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে তার মনে নেই। নিজেকে ভুলে গেছে যেন। সে পাগলের কান্নার আওয়াজ তার নিজের বুকের দরজা হাঁ করে খুলে দিয়ে গেল। যুগযুগান্তরের কান্না তার বুক ফেটে বেরিয়ে আসছে। এই কান্না কাঁদবে বলে সে আসমুদ্রহিমাচল ঘুরে বেড়িয়েছে। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে এর দরজায় তার দরজায় আঘাত করে বেড়িয়েছে। সাধন শিখতে চেয়েছে, যে সাধনে সব শোক ভুলে যাওয়া যায়। কিন্তু কোথাও কিছু পায়নি। এ কে? ততক্ষণ সে মাটিতে পড়েছে লুটিয়ে। নিজেকে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে নিয়ে গিয়ে সেই পাগলের পায়ের উপর ফেলেছে। পাগল চমকে উঠে ঝটকা দিয়ে তাকে দূরে ফেলেছে। সে আবার এসে জড়িয়ে ধরেছে দুই পা, বলেছে, আমাকেও ডাকতে শেখাও পাগল… আমার সর্বস্ব নাশ হয়ে গেছে পাগল, তুমি আমার এবার অবশিষ্ট যা কিছু আছে তার সর্বনাশ করে দাও। আমাকে ডাকতে শেখাও।

পাগল বলল, পা ছাড়। সে বেটির সঙ্গে আমার কাল রাত থেকে ঝগড়া। দিয়েছি আকথা, কুকথা বলে চাট্টি। তো তার এমন অভিমান হল যে কোথায় গেছেন সেই জানে। তুই দেখেছিস রাস্তায় তাকে?

সে এতক্ষণে যে সম্বিৎ ফিরে পেল। বলল, আপনি কাকে খুঁজছেন? আপনার জননী? কই কোনো কাউকে তো দেখলাম না রাস্তায়।

পাগল বলল, আরে শালা, এই মায়ের কথা বলছি, এই মা, এই যে আমার বড়মা… দেখেছিস কোথাও?

সে বলল, এই তো মা, মন্দিরে… এই যে… এই তো মায়ের প্রতিমা…

পাগল হাসল। বলল, চিনতে শিখিসনি এখনও। চিনে যাবি।

পাগল এবার মন্দিরের মধ্যে গিয়ে মায়ের মূর্তির সামনে দাঁড়ালো। স্থির দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে। দুই চোখ যেন বরফের চাঁই। গলে গলে জল নেমে এলো যেন দুই নদীর ধারা। বুক ভেসে গেল। তারপর চোখ বন্ধ করে দিল। সে মন্দিরের দরজার কাছে বসে পড়ল। এ কী দেখছে? আগে তো দেখেনি কোনোদিন! কী আশ্চর্য মানুষ এ? তাকালে মনে হচ্ছে একজন পাঁচ বছরের বাচ্চার দৃষ্টি। অথচ শরীর বলিষ্ঠ যুবকের মত। কে এ?

বেলা হল। দুপুর হল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হল। এখন রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর। ঝড়বৃষ্টি থেমেছে। শেয়াল ডাকছে কাছাকাছিই কোথাও। সেই প্রকাণ্ড বালক এখনও সেইভাবে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে। সহসা একটা মিষ্টি সৌরভে মন্দিরের ভেতর ভরে গেল। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে উৎস খুঁজে পায় না। এমন সময় সে পাগল বলল, প্রদীপ কই, প্রদীপ জ্বালো। মা এসেছেন। আরতির ব্যবস্থা করো।

সে তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে মন্দিরের মধ্যে খুঁজতে শুরু করল। সব পেয়ে গেল। কিন্তু আগুন জ্বালাবে কী দিয়ে?

পাগল জ্বালিয়ে দিল পঞ্চপ্রদীপ। জয় মা তারা… মা… মা… মা… আকাশ পাতাল কাঁপানো ডাকে কেঁপে উঠতে শুরু মন্দির, শ্মশান, আকাশ, মাটি সব সব সব। সে হাতজোড় করে তাকিয়ে। একবার মায়ের দিকে। একবার তার পাগল ছেলের দিকে। পাগল একবার তার দিকে ফিরে বলল, দুই হাতে জোরে জোরে তালি দে, দাঁড়িয়ে থাকিস না, দাঁড়িয়ে থাকলে মহাকালের বুকে মহাকালী দাঁড়িয়ে যান, মহাকালের সঙ্গে মহাকালীর লীলা দেখতে তালি দে…গলা ফাটিয়ে ডাক, মা…মা …মা তারা…।

ভোর হল। পাগল স্নান করে ভেজা গায়ে বসল নদীর ধারে। বলল, কী চাস?

সে বলল, মাকে।

পাগল স্থির চোখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল তার দিকে। তারপর বলল, পারবি মাকে ধরে রাখতে? পারবি সব ছেড়ে মায়ের দাস হয়ে আজীবন কাটাতে? পারবি?

সে বলল, মা চাইলে পারব, তুমি চাইলে পারব… আমি একা পারব না। সে ক্ষমতা নেই আমার, তোমার থেকে ভালো আর কেউ জানে না বাবা এটা…

পাগল বলল, ধুলো…ধুলো…মায়ের কৃপায় কাদা হয়…তারপর মা গড়ে নেন… কাদা না হতে পারলে ধুলো ধুলো হয়ে উড়ে যাবি… কাদা হয়ে যা…মানুষের বিচার করা ছাড়…সব মায়ের সন্তান…কাউকে ঘেন্না না…কাউকে নীচ চোখে দেখা না…পারবি?...তবে হবে…পারবি?...শুচি অশুচি…উঁচুনীচু সবকে সমান জেনে নিজেকে মিলিয়ে কাদা হয়ে যেতে পারবি?...হবে তোর মা ডাক সার্থক হবে…তবে মা আসবে…জয় মা…জয় মা…মা মা…মা তারা…

পাগল উঠে গেল। দেখতে দেখতে মিলিয়ে গেল শ্মশানের মধ্যে। সে তাকিয়ে দেখল কিছুক্ষণ। সংসারে এতবড় শূন্যতা, এত এত ছলনা এ পাগল এক “মা” ডাকে ভরে রেখেছে কী করে? তার পায়ের কাদা পায়ের ছাপে মিশে আছে। সে একটা আঙুল দিয়ে সে কাদা কপালে ঠেকালো। আরো কিছুটা কাদা নিয়ে বুকে লিখল, মা তারা…মা…মা …মা

শুনতে পেল মন্দির থেকে ঘন্টার আওয়াজ। শাঁখের আওয়াজ। মা…মা…মা…। সমস্ত আকাশ বাতাস মাটি জল গাছাপালা শ্মশানের হাড়গোড়গুলো যেন জপের মালা ফিরিয়ে চলেছে…আর জপে চলেছে মা মা মা…জয় মা তারা…জয় মা…জয় মা…

 

(ছবি: Debasish Bose)