ট্রেন আসতে দেরি। স্টেশানে বসে। বৃষ্টির ছাঁট আসছে শেডের তলাতেও।
হঠাৎ বোঁচকাবুচকি সরিয়ে একজন ধড়ফড় করে উঠে বলল, এই শুয়োরের বাচ্চা…. বিড়ি আছে?
বিজন মাষ্টার চারদিক তাকালো। রাত হয়েছে। স্টেশান ফাঁকা প্রায়। বিজন মাষ্টার বলল, সিগারেট আছে…..
সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, পায়ে পড়ব…. তবে দিবি না কি রে হারামজাদা….
বিজন মাষ্টারের বয়েস হয়েছে। এই গ্রামের স্কুলেই গোটা জীবন গেল। আর দু'বছর পর অবসর। আজ এক পুরোনো ছাত্রীর বিয়ের নেমন্তন্ন ছিল। দেরি হল। এত ভালোবেসে আটকে রাখল। বৌয়ের জ্বর এসেছে। নইলে আজ থেকেই যেত।
বিজন মাষ্টার বলল, দিচ্ছি তো… গালাগাল করছেন কেন?
সে সিগারেটটা হাতে নিয়ে মুখ ভেংচিয়ে বলল, আবার আপনি-আজ্ঞে করা হচ্ছে… কেন রে শালা আমি কি তোর কুটুম? তোর মেয়ের সঙ্গে আমার ছেলের বিয়ে হয়েছে, নাকি আমার ছেলের সঙ্গে তোর মেয়ের বিয়ে হয়েছে….. দেশলাই কে দেবে? তোর শ্বশুর?
বিজন মাষ্টার বলতে গেল উদাহরণে দুটো বাক্যই তো একই অর্থ বহন করছে…. না বলে বলল, আপনি কি এখানেই থাকেন?
সে বলল, না রে, তাজমহলে থাকি…. সমুদ্দুরে হেগে এখানে ছুঁচাতে এসেছি….. হয়েছে?
বিজন মাষ্টার দেশলাইটা দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। এখানে বসা ঠিক হচ্ছে না। একটু দূরে গিয়ে বসল। ট্রেন দেরি আছে। লেট আছে। হঠাৎ আচমকা পাগল কোত্থেকে আবার উদয় হল। বলল, পুরো প্যাকেটটা রেখে যা। ভালো মাল।
বিজন দিয়ে দিল।
পাগল ঝপ্ করে বিজনের পাশে বসে বলল, রামায়ণ পড়েছ? মহাভারত?
বিজন বলল, হ্যাঁ…
ওখানে কোনো পাগলের কথা লিখেছে?
বিজন ভাবল খানিক। মনে পড়ছে। না।
পাগল আবার বলল, গীতা পড়েছ? ওখানে আমাদের কথা আছে?
বিজন বলল, না তো।
পাগল আকাশ কাঁপিয়ে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে কেশেটেশে একাকার। খানিক বাদে সামলে বলল, তবে আমাদের জন্য কোনো শাস্ত্রই নেই….. হো হো…..
বিজন বলল, তা কেন… সব মানুষের কথাই আপনার কথা…. ওদের দেওয়া উপদেশই আপনাদের জন্য…..
পাগল হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, বেশ মেঘ, কী বলো… কোথায় যাচ্ছ?
বিজন বলল, বাড়ি…. এখানে আমি স্কুলে পড়াই…..
পাগল বলল, জানি জানি। তোমাকে বিস্তর চিনি।
বিজন বলল, আমাকে চেনেন?
পাগল বলল, বাহ্! সেই যে আমার তখন মাথা খারাপ শুরু হয়েছে…. স্কুলের সামনে বসে তোমাদের গাল পাড়তাম…. তুমি আমাকে সরিয়ে দিলে…..
বিজন বলল, মনে পড়ছে না।
পাগল বলল, ওই তোমার ট্রেন আসছে….. যাও…..
বিজন দেখল ট্রেন আসছে। ফাঁকাই ট্রেন। উঠে বসল। ট্রেন বৃষ্টির মধ্যে অন্ধকার ভেদ করে ছুটছে। কে পাগল? কাকে সরিয়ে দিয়েছিল?
হঠাৎ মনে পড়ে গেল। তাদের স্কুলের এক মাষ্টারের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল একজনের বউ। বাচ্চা রেখে। তার বর পাগল হয়। স্কুলের সামনে এসে…. ও হ্যাঁ…. ওরই তো ছেলে…. মাসির বাড়ি মানুষ হল… ওর ছেলের সঙ্গেই তো তার ছাত্রীর বিয়ে হল….. কে যেন বলছিল…. তখন অত মন দিয়ে শোনেনি… তাছাড়া মাথাটা এত ধরে আছে বিকেল থেকে কিছু ভাবতেও ইচ্ছা করছিল না…কিন্তু….. শিরদাঁড়া বেয়ে বরফগোলা জল নেমে গেল। ও তো রেলে কাটা পড়েছিল। বিজন মাষ্টার চমকে দেখে কম্পার্টমেন্টের একদম উল্টোদিকে বসে সে পাগল তার দিকে তাকিয়ে হাসছে….. ইশারায় কী যেন ইঙ্গিত করছে তাকে…. ডাকছে।
বিজন মাষ্টার যন্ত্রচালিতের মত উঠে গেল। পাশ থেকে একজন বলল, ও মশায়… আপনার ব্যাগ…. ও মশায় আরে দরজার দিকে যাচ্ছেন কেন….. আরে আরে….
Category
- Log in to post comments
- 4 views