দোকানের আলোগুলো নিভিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে থমকে দাঁড়ালো। কেন মনে হল নীল পাঞ্জাবি পরা কালো ম্যানিকুইনটা আলো নেভানোর পর তার দিকে ঘুরে তাকালো?
ঘড়ি দেখল। রাত এগারোটা চল্লিশ। হিসাব মিলিয়ে বেরোতে এমনিই দেরি হল। না গেলেই ভালো। কিন্তু কৌতূহলটা তাকে ফিরতে দিচ্ছে না।
উঠলো আবার। তালা খুলে আলোগুলো জ্বাললো। ম্যানিকুইনটা রাস্তার দিকে মুখ ঘুরানো, যেদিকে কাঁচের দেওয়াল আছে। সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ঠিকই তো আছে।
আলোগুলো নেভালো। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মানিকুইনটার দিকে তাকালো। মনে হচ্ছে যেন ম্যানিকুইনটা ধীরে ধীরে তার দিকে ঘুরছে। কী হচ্ছে? আবার আলো জ্বাললো। নাহ, একই তো জায়গায় দাঁড়িয়ে। বারবার এরকম কেন মনে হচ্ছে?
নীচে নামতে নামতে ঘড়ি দেখল, বারোটা পাঁচ। হঠাৎ দোকানের মধ্যে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার আওয়াজ পেল। দৌড়ে উপরে উঠলো। তালা খুলল। আলোগুলো জ্বাললো। কালো ম্যানিকুইনটা পড়ে আছে। কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। ঝুঁকে ম্যানিকুইনটা সোজা করে দাঁড় করালো। ম্যানিকুইনটার ঠোঁটের কাছে ওটা কী? আঙুল ছোঁয়ালো। রক্ত!
আচমকা একটা আওয়াজে পাশ ফিরে তাকালো। দেখে, দোকানের বাকি আটটা ম্যানিকুইন তার দিকে তাকিয়ে। এটা পাঞ্জাবির দোকান। প্রতিটা ম্যানিকুইনের গায়ে এক এক রঙের পাঞ্জাবি। এবার সে খেয়াল করল, কালো ম্যানিকুইনটা সোজা তার চোখের দিকে তাকিয়ে।
হঠাৎ করে দোকানের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। আলোগুলো একটা একটা নিভতে শুরু করল। তার মাথার কাছের আলোটা শুধু জ্বলে রইল। মনে হচ্ছে অনেকগুলো মানুষ যেন ঘরে শ্বাস নিচ্ছে। সামনের কালো ম্যানিকুইনটা তার দিকে এগিয়ে আসছে, খুব ধীরে। মেঝেতে পা ঘষার আওয়াজ হচ্ছে। আরো চারদিক থেকে পা ঘষার আওয়াজ। আলো আঁধারিতেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আশেপাশের ম্যানিকুইনগুলো তার দিকে এগোচ্ছে।
হঠাৎ করে বাইরের সিঁড়ি থেকে আওয়াজ শুরু হলো। কারা যেন উঠছে। দোকানের দরজাটা খুলে গেল। তার স্ত্রী দোকানের দুই কর্মচারীকে নিয়ে দাঁড়িয়ে। একজন কর্মচারী দোকানে ঢুকে একটা একটা করে আলো জ্বালালো। ভেতরে এলো সবাই। স্ত্রী বলল, তুমি ঠিক শুনেছ, দাদাবাবু বলেছিলেন সব হিসাব মিলিয়েই আসবেন? ঘরেই আসবেন বলেছিলেন নাকি অন্য কোথাও যাবার ছিল?
একজন কর্মচারী তার দিকে এগোচ্ছে। বলতে বলতে এগোচ্ছে, আমি ঠিক শুনেছিলাম বৌদি, এইতো দাদাবাবু ঠিক এইখানে বসেছিলেন। কিন্তু পুতুলগুলো সব এদিক-ওদিক করলো কে? জ্যোতির্ময়, দেখতো ক্যাশ বাক্সটা ঠিক আছে কিনা? মনে হচ্ছে দোকানে কেউ এসেছিল। জ্যোতির্ময়, এদিকে একবার এসো তো, এই পুতুলটা এখানে আগে ছিল? এটা দাদাবাবুর পরা পাঞ্জাবিটা না?
স্ত্রী বলল, চলো। কোথাও গেছে হয় তো। ফোনটা বাড়িতে রেখে এসেছিল বলেই চিন্তা। তোমরা এগোও, আমি আলোগুলো নিভিয়ে আসছি।
দোকানের দুই কর্মচারী নেমে গেল। দোকানের সব আলো নিভিয়ে স্ত্রী বাইরে বারান্দায় জ্বলে থাকা আলোর নীচে দাঁড়ালো। কালো ম্যানিকুইনটার মাথার কাছের আলোটা জ্বলে উঠল হঠাৎ। তার মুখে ফুটে উঠল হাসি। স্ত্রীর ঠোঁটেও তখন বাঁকা হাসি।