বাঙালির মাতৃভাষা কী?
আপামর সাধারণ বাঙালি যে ভাষায় বাধ্য হয়ে জন্মায়। আর যে ভাষা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমরণ লড়াই চালিয়ে যায়। সে হল বাংলা।
বাঙালির বাংলা ভাষার রূপক কী?
বাঙালির বাংলা এখন পাড়ার শীতলা ঠাকুরের মত। কুলীন দেবদেবীর মর্যাদা হারিয়েছেন। ইংরেজি আর হিন্দি এখন শিব, নারায়ণ, গনেশ, কালীর মত।
বাঙালির সরস্বতীর কী দশা?
তিনি ক্রমে বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি আর হিন্দির পাঠ নিচ্ছেন। সরকারি বিদ্যালয়গুলোতেও তাই শিখতে শুরু করেছেন। শুনেছি ওঁর হাঁসটাও কেউ বাংলায় কথা বললে চমকে ওঠে। বলে, চুপ চুপ। ধীরে ধীরে।
তবে বাঙালির মাতৃভাষা কী?
ইংরেজিতে যাকে বলে টেকনিক্যালি, সেই অনুযায়ী বাংলা। তবে, আদতে বাঙালির কোনো মাতৃভাষা নেই। তার প্রাণের আবেগ ভাসে হিন্দিতে। তার রোজগারের জোয়াল ঠেলে ইংরেজিতে।
বাংলার ব্যবহার কোন সময় বেশি তবে?
আপামর বাঙালি যখন ক্ষুব্ধ হয়, ক্রুদ্ধ হয়, বেজায় চটে তখন অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে কিছু শব্দ উচ্চারণ করে যা এখানে লেখা সম্ভব নয়। তবে আজকাল শহুরে বাঙালিরা রেগে গেলে, বিরক্ত হলে কথায় কথায় ইংরেজি অভিধানও "ফাঁক" করে দেখে দেখেছি।
তবে আজকের দিনটা তুমি কীভাবে কাটাও?
বাঙালির একটা দিনপঞ্জি আছে জানো তো? যার মতে আজ ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ সাল। কিন্তু সে কথা আমাদের অজানা। কিন্তু পয়লা বৈশাখ, পঁচিশে বৈশাখ, বাইশে শ্রাবণ যেমন উৎসবের নাম হয়ে গেছে দিনপঞ্জির ধারাবাহিকতা ছেড়ে, এ ভাষাটাও তেমন।
বড্ড বেশি নেগেটিভ হয়ে যাচ্ছ না?
আসলে আঘাত যতটা সত্যকে দেখতে পায়, বিচারক অতটা পায় না। একজন দেখে ভেতর থেকে, আরেকজন দেখে বাইরে থেকে। ভেতরের ক্ষয়টা ভেতরের লোকই জানে।
আশা নেই?
আশা সব সময়েই আছে। একদিন মহাপ্রভু থেকে মতুয়াধর্মের প্রণেতা হরিচাঁদ ঠাকুর এই বাংলা ভাষাতেই বাঙালিকে জাগিয়েছিলেন, মাতিয়েছিলেন। বাঙালি মহাপ্রভুকে তাও ক্ষীণ মনে রাখল, সেও মেলা বিদেশি ভক্ত, প্রতিষ্ঠান হল বলে। কিন্তু হরিচাঁদকে ভুলে গেল প্রায়। আম্বেদকরের নাম যতবার উচ্চারিত হয় এ মানুষটার নাম আর কেউ বলে না। আম্বেদকরের না হয় মেলা পাশ্চাত্য দর্শনের বইটই পড়ে আলোর পথ পেয়েছিলেন। কিন্তু হরিচাঁদের তো সে ইতিহাস না। তিনি প্রাণের আলোয়, মহাপ্রভুর শিক্ষায় বললেন, অচলায়তন ভাঙো। শিক্ষার আলো আনো। মহিলাদের সামনে এগোতে সাহায্য করো। পথ ছাড়ো।
কিন্তু এ তো সেদিনের কথা। আজ?
আজ যখন বলা হচ্ছে ইংরেজি না জানলে কাজ হবে না। তখন কথাটাও ফাঁকি আছে। কাজ ইংরেজি তৈরি করে, না মানুষে করে? কাজ ভাষা তৈরি করে না প্রয়োজন তৈরি করে? বাঙালির ভাষা যেদিন আবার মানের ভাষা হবে, সে সোজা দাঁড়াবে। ইংরেজিকে তাড়িয়ে নয়। হিন্দিকে ব্রাত্য করে নয়। নিজেকে স্থাপন করে। বাঙালি যেদিন নিজের পোশাক, সংস্কৃতি, খাবার, তীর্থ সবকে সগর্বে আঁকড়ে ধরবে সেদিন এটা হবে। তামিলনাড়ু এ দেশেরই রাজ্য। কীভাবে নিজের সব কিছুর জন্য লড়াই করে টিকিয়ে রাখতে হয় সেটাই তারা দেখাচ্ছে। এটা হলেই বাংলা জানলেও কাজ পাওয়া যাবে। কারণ সেদিন যে কাজ দেবে আর কাজ করবে তারা দুজনেই বাংলার পরিচয়ে পরিচিত হতে গর্বিত। তার আত্মবিশ্বাসের মূল সঠিক মাটি পেয়েছে সেদিন।