শ্রীরামপুর স্টেশান। সকাল সাতটার কাছাকাছি। পাশেই মাছের আড়ত। প্ল্যাটফর্মে মাছের গন্ধ ম ম করছে। ট্রেনের ঘোষণা হল। তারকেশ্বর লোকাল।
ভিড় নেই। মেঘলা হয়ে আছে। ট্রেন এলো বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে। যাত্রা শুরু হল ভিজতে ভিজতে। শ্রাবণ মাসের বুধবার। মন্দিরে জল ঢালতে যাওয়ার ভিড় কম। বাইরে সবুজ মাঠের উপর মেঘের ছায়া। পাতলা ফিনফিনে পর্দার মত বৃষ্টির ধারা ঝাপসা করে রেখেছে সব। রহস্যের মত।
সামনে দরজার কাছে বসে এক বৃদ্ধ। গায়ে গেরুয়া। রোগা শরীর, রুগ্ন নয়। চোখে কালো কার্বন ফ্রেমের চশমা। যে উঠছে নামছে তাদের দিকে তাকিয়ে দেখছে। তাদের বিরক্তি, উপেক্ষা, ব্যস্ততা, উদাসীনতা --- সব দুই চোখের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে।
স্টেশনের পর স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছে। এখন এমন অনেকে উঠেছে যাদের গন্তব্য মন্দির। ভিজে গা। বুকের কাছে প্লাস্টিকে বানানো ঘটি। গলায় অনেকের মালা। আকন্দের মালা। চোখেমুখে উদ্বিগ্ন-উৎসাহ। সাধু বসে আছে। দরজার কাছেই নিরালায় আসন পেতেছে। মেঘলা আকাশ তার চশমার কাঁচের উপর টুকরো টুকরো গল্প লিখে যাচ্ছে। গোটা ট্রেন মূলত নিস্তব্ধ। খুব সকালে মানুষ বেশি কথা বলে না। তার উপর এমন মেঘের অন্ধকারে ঢাকা সকাল। মনের একদিকে ভাষা আরেকদিকে কালের অন্ধকারে ডুবন্ত গা। মন ডুবে আছে। মনের ডুবন্ত গায়ের দিকে তাকিয়ে সাধু, দরজার কাছে বসে বসে গুনগুন করছে। ফাতনায় টান লেগেছে সাধু?
তারকেশ্বর ঢুকতেই উচ্চৈঃস্বরে মাইকের আওয়াজ ভেসে এলো। হুড়মুড় করে অনেকে নেমে গেল। অনেকেই উঠল। এ ট্রেন আরো যাবে। গোঘাট। গোঘাটে নামলে গাড়ি করে কিছুদূর গেলে জয়রামবাটী, কামারপুকুর। তীর্থক্ষেত্র। আধুনিক যুগের।
ট্রেন তারকেশ্বর ছেড়ে বাঁক নিল। লম্বা লম্বা দূরত্ব। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। শহুরে চালচলন, আদব-কায়দা খসে গেছে। স্টেশানগুলোর গড়ন, ভাষা মেঠো। মিশতে চেয়েও পারছে না। নাকি মিশেও মিশতে চাইছে না।
আশ্রমের ঘর। কত তলা জানি না। লিফট আছে। সর্বোচ্চ তলায় খোলা জানলার বাইরে চোখ। যেদিকে চোখ যায় সবুজ সবুজ আর সবুজ। চাষ হচ্ছে। আশ্রমের মধ্যে কলকাতার গন্ধ। আশ্রমের বাইরে গ্রাম। দু'জনেই মুখোমুখি। মিশছে না। বিষন্নতা কি বৈরাগ্যের আরেক নাম? বাণী মুখস্থ বলতে পারলেই কি মহাপুরুষত্ব অর্জন করেছি আমি? মহাপ্রাণ কই? যার ডাকে পাণ্ডিত্যাভিমান, ত্যাগাভিমান, সাধকাভিমান, অর্থাভিমান, দৈন্যাভিমান, প্রতিষ্ঠাভিমান দূরে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে থাকে সে ডাক কই? গাড়ি চালাচ্ছে গ্রামের একজন। সে বলে, আমরা আশ্রমে এখন আর আগের মত যাই না। বাধে। কীসে বাধে? এ উত্তর জানা। সবার জানা। কিন্তু মানার আর বলার পার্থক্য। গাড়ি চলেছে বাঁকুড়া থেকে বর্ধমান। হুগলির সবুজ, বাঁকুড়ার সবুজ পেরিয়ে বর্ধমানের সবুজ। তারপর যাব বীরভূম।
ট্রেন ক'টায় আপনাদের?
গেলেই ট্রেন। চলো।
তেভাগা এক্সপ্রেসের জেনারেল কোচ। বসার জায়গা নেই। দাঁড়িয়ে। কী ভিড় কী ভিড়! এত ভিড়ে কাঠের ঝাঁকা মাথায় নিয়ে উঠল তিন মহিলা। বসবে কোথায়? ওই তো জায়গা। ওই যে ওই দিদির পায়ের কাছে। সাইডে যে বসার জায়গা। ওই দিদির শাড়ির আঁচলের খাঁজে খাঁজে হেলান দিয়ে বসে যাব। বসেও গেল। আমার বসতে তো বাধা নেই বাবু। আমার পাছায় না আছে বিদ্যার ছাপ, না আছে অর্থের বড় পাসবইয়ের ছাপ। শাড়িও তো দেখছ কেমন। লক্ষ্মী দিলেন যেমন তাই চলেছে এমন। খুশিই আছি। গল্প করো বুঝবে। এসো কথা বলো। এই যে টিফিন কৌটোয় ভাত। উপুড় চুপুর ভাত। তার উপরে কাদা ধোয়া জলের মত ওটা ডাল। তার পাশে দুটো কচু ভাজা। আমি খাই তুমি দেখো। তুমি খেলে নাও, আমার কম পড়বে না। আমাদের কম পড়ে না। তোমাদের গুনতিতে আমরাই কম পড়ে যাই।
রামপুরহাট। আজ অমাবস্যা। মায়ের পুজো। আজ আকাশে চাঁদ নেই। দোল নয়, রাস নয়। আজ অমাবস্যা। আজ মায়ের দিন। আজ লীলার দিন না। আজ দুই চোখে জল ভরে মায়ের কাছে দাঁড়ানোর দিন --- মা, ভক্তি দাও; মা আমার অভিমান দূর করো; মা আমাকে 'মা' ডাক শেখাও; মা আমাকে দেখাও 'মা' ডাকে কেমন করে আহ্নিকগতি বার্ষিকগতি প্রাণের গতিতে ছন্দ তুলে সবাইকে এক মাটিতে এনেছে; মা, আমার অভিমান ভোলাও; মা, এবার আমার ভাষাকে বিরাম দাও; এবার আমাকে ছুঁয়ে বলো, আমার শুচি অশুচি দুই গেছে; আমাকে মা ডেকেছে।
Category
- Log in to post comments
- 1 view