Skip to main content

 

ননী হাড়ুইয়ের সাত কূলে কেন, কোনো কূলেই কেউ নেই। কয়েকটা ইট পর পর তুলে দিলে যদি দেওয়াল হয় তবে ননীর বাড়ির দেওয়াল আছে। কিন্তু কোনো ইটের সঙ্গে কোনো ইটের তেমন সামঞ্জস্য নেই। অনেক ইটের মধ্যে গাছ। অনেক ইটের মধ্যে চার পাঁচ আঙুল ফাঁক। মাথার উপর টালি। টালির উপর আকাশ। আকাশের দিকে তাকাতে ছাদ বাধা হয় না, বেশ কয়েক জায়গায় ফাঁক হয়ে আছে। ননী এসব নিয়ে ভাবে না। ভাবার জন্য একটা মাথা ননীর আছে, কিন্তু মনটা মজা নদীর মত বাঁক খেয়ে মুখ থুবড়ে কিছুটা বুকের মধ্যে আর বাকিটা মাথার মধ্যে পড়ে আছে। ননী আগে গাছের পাতা ঝুরাতো, জঙ্গল সাফ করত। এখন কিছু করে না। ভিক্ষা করে, কিন্তু ভিখারির মত না। বায়না করার মত। তাও একদিন কী দুদিন অন্তর।

দুদিন হল ননী জ্বরে পড়ে আছে। শেষরাত থেকে জ্বরটা একটু ছেড়েছে। ননী দুটো মুড়ি জল দিয়ে খেয়ে বিছানায় শুতে শুতে মনে করেছে রাত হয় তো দুটো কি আড়াইটে হবে। কিন্তু ভোর হতে বেশিক্ষণ ছিল না। শ্রাবণের মেঘের ছায়ায় ভোরের আসার কথা টের পায়নি ননী।

হঠাৎ করে মেঘ ডাকাতে চমকে উঠল ননী। দুর্বল শরীরে ধড়ফড় করে উঠে বুকটা ধড়াস ধড়াস করতে শুরু করল। মনে হল প্রাণটা বেরিয়ে যাবে এখনই। গলা শুকিয়ে কাঠ। দেওয়ালে মা আর বাবার অনেককালের পুরোনো ছবি টাঙানো। বাবার মাথাটা উইয়ে খেয়ে গেছে। মায়ের গলার নীচ থেকে নেই। সেদিকে তাকালো ননী। ওপারে গেলে কে চিনবে তাকে? কিন্তু হঠাৎ মনে হল মেঘের ডাকে তার ঘুম ভাঙেনি। সে স্বপ্ন দেখছিল বাবা লোকনাথের মন্দিরের সিঁড়িটা সে ফিনাইল দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছে। ভটচাজ পুরুত বলছে ননী ওদিকটা, ওদিকটা, আরো ভালো করে টান। মার্বেল পাথরের উপরের ননীর মুখটা কালো ছায়ার মত পড়েছে। তার উপর কালো ফিনাইল বুলিয়ে দিচ্ছে ননী। মুখটা ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ফিনাইলের গন্ধটা কেন আসছে এখনও নাকে? ননী উঠল টলতে টলতে। ঘরে কোথাও তো নেই। তবে? গন্ধটা রাস্তার দিক থেকে আসছে। ননী দরজা খুলে বাইরে এসে দেখে বাড়ির সামনে একটা ফিনাইলের বোতল ভেঙে পড়ে। রাস্তার গর্তে অনেকটা ফিনাইল জমে। কালো ফিনাইল। ওই গর্তে দুদিন ধরে বৃষ্টির জল ছিল। আকাশের দিকে তাকালো ননী। একটু পরেই নামবে। ঘরে গেল। একটা প্লাস্টিকের মগ আর তার ছেঁড়া গেঞ্জিটা নিয়ে এলো। রাস্তার ধারে উবু হয়ে বসল। তারপর গেঞ্জিটা গর্তে চুবিয়ে চুবিয়ে ফিনাইল তুলতে লাগল আর মগে ভরতে লাগল। অল্প বাতাস দিল। সামনের হোগলা বনটা শ্রাবণের জোলো বাতাসে দুলে উঠে বলল, ননী তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি। দেখতে দেখতে বৃষ্টি এলো ঝেঁপে। তার টিনের চালা থেকে ঝমঝম আওয়াজ ভেসে এলো। ননী ফিনাইলের মগটা বুকের কাছে এনে, মাথাটা নীচু করে আড়াল করে বাড়িতে এসে ঢুকল। বাড়ির মধ্যে ফিনাইলের গন্ধ ম ম করতে শুরু করল।

ননী খাটে বসল। ছোটোবেলার কথা মনে পড়ছে। পুজোর আগে মা ফিনাইল দিয়ে এই ঘর, সামনের বারান্দা মুছত। দিদি আর সে খাটের উপর বসে থাকত। দিদি নাকে কাপড় দিয়ে রাখত। ওর নাকি ফিনাইলের গন্ধে গা গুলাতো। দিদির ছবি নেই ঘরে। দিদি করোনায় মরে গেল।

কিন্তু কী করবে সে ফিনাইল নিয়ে? মেঝের দিকে তাকালো। এ মেঝের এত তেষ্টা এইটুকু ফিনাইলে কী হবে? জল দিয়ে মুছেছে কবে সে? মনে নেই। সামনের বারান্দাটার অর্ধেকের বেশি ইট নেই। তবে? ননী ফিনাইলের মগটা মাথার কাছে নিয়ে শুয়ে পড়ল। কার ফিনাইল এটা? কে ভাঙল রাস্তায়? বাইরেটা সন্ধ্যের মত অন্ধকার। ননী ফিনাইলের মগে ডান হাতের একটা আঙুল চুবিয়ে কপালে টিপের মত করে পরল। গন্ধটা তীব্র হল আরো। জ্বালা করছে কি কপালটা? অনেকে ফিনাইল খায় না? কিন্তু কেন খাবে সে? কীসের তাড়া? কীসের রাগ অভিমান? কিছু নেই তার। ননী ঘুমিয়ে পড়ল। আবার যখন ঘুম ভাঙল তখন বিকেল। হিসি পেয়েছে। উঠল। বাইরের ঝোপ থেকে ঘুরে এসে আবার শুয়ে পড়ল। একটু পর অন্ধকার নেমে যাবে। ফিনাইলের মগটা নিয়ে খাটের নীচে রেখে দিল। হঠাৎ মনে পড়ল রাস্তায় ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো তো তোলা হয়নি? তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। ঝিরিঝির বৃষ্টি পড়ছে। ননী লুঙ্গিটাকে ভাঁজ করে রাস্তার উপরটা পরখ করতে শুরু করল। ভাঙা কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে এখনও। একটা একটা করে হাতে নিয়ে লুঙ্গির ভাঁজে রাখতে শুরু করল। জমে গেল অনেক টুকরো। তারপর ঝোপের মধ্যে ফেলতে ঢুকল। অনেকটা ভেতরে যেতে হবে, নাহলে কারোর পা কাটবে। ফেলে এসে যখন ঘরে ঢুকল তখন ঘরটা অন্ধকার। খাটে শুয়ে ননীর মনে হল গোড়ালির কাছটা জ্বালা জ্বালা করছে। হাত দিল। মনে হল রক্ত। বাইরে এলো। রাস্তার আলোর নীচে দাঁড়িয়ে ভালো করে তাকিয়ে দেখল। পা টা জ্বলে যাচ্ছে। কামড়ে গেছে। কীসে? কালাচে নাকি চন্দ্রবোড়ায়? ননী ঘরে এসে খাটের তলা থেকে ফিনাইলের মগটা বার করল। ঢক ঢক করে গিলে ফেলল। বিষে বিষে বিষক্ষয় হয়ে যাবে। মগটা খাটের উপর রেখে মেঝেতে শুলো ননী। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড়ের হাওয়া বৃষ্টির সঙ্গে মিশে ছাদ দিয়ে, দেওয়াল দিয়ে ঢুকে পড়েছে। ননীকে ডাকছে, চল চল চল, ননী দেওয়াল ভেঙে যাবে আজ। চল চল।

ভোরে সত্যিই দেওয়াল ভেঙে পড়েছিল ননীর বুকের উপর। অভিযোগহীন, দাবীহীন খোলা দুটো চোখ আকাশের দিকে তাকিয়ে। ফুল তুলতে এসে ও পাড়ার বুড়িটা ঝুঁকে পড়ে ডাকছে, ননীদা, ও ননীদা। বুড়ির আঁচলে বাঁধা জুঁইয়ের গন্ধে ভাঙা ঘর তখন ম ম করছে। কে বলবে এই ঘরেই কাল ফিনাইলের গন্ধের আমন্ত্রণ ছিল?

↑