Skip to main content

 

কয়েকটা কথা মনের মনের মধ্যে পাক খেয়ে যাচ্ছে। কথাগুলো কারোর প্রতি অশ্রদ্ধায় বা বিরূপতায় বলা নয়। নিজের চিন্তাটাকে স্পষ্ট করে রাখার জন্য বলা।

আগে ছোটবেলায় যখন পাড়ায় পাড়ায় এত ওষুধের দোকান হয়নি, ডাক্তার দেখানো এত সহজ ছিল না, তখন একটা কথা প্রায় শুনতাম, এত সহ্যশক্তি কম হলে চলে? এখন কথাটা তেমন শোনার দরকার হয় না। জ্বর হলে প্যারাসিটামল এর জন্য অনেক দূর দৌড়াদৌড়ি করতে হয় না। দরকার হলে ডাক্তার খুঁজে পেতেও খুব অসুবিধা হয় না। অবশ্যই সব জায়গায় নয়, স্থান বিশেষে। এর মানে আমি এই বলতে চাইছি না যে সামান্য কিছুতেই ডাক্তারের কাছে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে বা ওষুধ খেতে হবে। আমি বলতে চাইছি যখন উপায় ছিল না তখন সহ্যশক্তির যে মাহাত্ম্য ছিল আজ তা নেই।

একজন মানুষের ফোঁড়া কাটার আগে তিনি নাকি মন শরীর থেকে তুলে নিতেন, বিনা এনেসথেসিয়া তাকে অপারেশন করা যেত। এ কথা শুনে আমার কোনদিনই তেমন বিশাল কিছু মনে হয়নি। আমি মন তুলে নিলে আমার ব্যথা লাগে না কিন্তু সেটা তো সার্বজনীন সত্য হতে পারে না। একটা দাঁত তুলতে গেলে জায়গাটাকে অবশ না করে নিলে আমি অপারেশন করানোর কথা ভাবতে পারিনা। জ্বর হলে অকারণে সহ্য করে শুয়ে থাকার কথা ভাবতে পারি না। আমার প্যারাসিটামল লাগে। যদি মানুষ এমনই ভাবতো যে অমুক যদি সহ্য করতে পারে তবে সবাই সহ্য করতে পারবে না কেন, এটাই সার্বজনীন নিয়ম হোক, তবে মানবজাতির যে কী দুর্দশা হতো তা সহজেই অনুমেয়। ভারতের মাটিতে এমন অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষের কথা মুখে মুখে ফেরে। আমরা সেগুলো বলে আনন্দ পাই কিন্তু নিজের বেলায় সেগুলোকে পালন করার কথা ভাবতেও পারি না। ভাবতে যে পারিনা সেটাই স্বাভাবিক। এবং অবশ্যই মঙ্গলের।

আজকাল বেশ কিছু আধ্যাত্মিক জগতের মানুষ হঠাৎ করে চেতনা, মন, অনুভব ইত্যাদি নিয়ে নানাবিধ ব্যাখ্যা দিয়ে চলেছেন এবং ইন্টারনেট জুড়ে তা ভীষণভাবে জনপ্রিয় হচ্ছে। তাদের বক্তব্যের একটা মূল বিষয় হল ভারতীয় দর্শনে নাকি চেতনার ব্যাখ্যা এবং বর্তমানের নিউরোসায়েন্স তথা কগনিটিভ সায়েন্সের ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। বিভিন্ন বিতর্ক সভায় তারা বিজ্ঞান জগতের মানুষদের বিস্মিত করে চলেছেন সেই সব প্রাচীন দর্শনের উদাহরণ দিয়ে দিয়ে এ কথাও তারা দাবি করছেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে কিছু সত্যতা রয়েছে। পাশ্চাত্যের অনেক মনীষী তথা বিজ্ঞানের মানুষও ভারতীয় দর্শনের প্রশংসা করেছেন এ কথা সত্যি। কিন্তু প্রশংসা করা এক আর তাকে সত্য বলে স্বীকার করা আরেক।

বেদান্ত দর্শন, বৌদ্ধ দর্শন মানুষের মন চিন্তা ইত্যাদি নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেছেন বিশ্লেষণ করেছেন এ সত্য। কিন্তু কোন সত্য সিদ্ধান্তে তারা উপনীত হয়েছেন বলে যখন প্রচারিত হয় তখন আমার ভয় লাগে। সত্যসিদ্ধান্ত বলতে আমি বিজ্ঞানগত বাস্তব সিদ্ধান্ত বলছি। যত দিন যাচ্ছে মানুষ নিজের মস্তিষ্ককে এবং নিজের স্নায়ুতন্ত্র কে আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা পাচ্ছে। এবং নানা সত্য উদঘাটন করছে। তার সঙ্গে বেদান্তের বা বৌদ্ধ দর্শনের কোন সম্পর্ক নেই। বেদান্ত দর্শনে বা বৌদ্ধ দর্শনে যেসব দার্শনিক সিদ্ধান্ত আছে সে দার্শনিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই সত্যি। বিজ্ঞানের নিজের একটা দর্শন আছে, কখনো কখনো বিজ্ঞানের সে দর্শন সেইসব অতীন্দ্রিয় দর্শনের কাছাকাছি এসেছে এও সত্য। কিন্তু এই দুই দর্শনের কাছাকাছি আসা সত্যকে যখন বস্তুগত সাযুজ্য ঘটেছে এমনভাবে দেখানোর ন্যারেটিভ তৈরি হচ্ছে তখন সেটা ভয়ের। ভারতবর্ষে সিউডোসাইন্সের কোনদিনই অভাব ছিল না। আজ নতুন করে আবার এক সিউডোসাইন্সের জন্ম নিচ্ছে দেখে দুশ্চিন্তাই হচ্ছে।

চেতনা কী, আবারও বলছি এর সঠিক উত্তর আমরা এখনো জানিনা। বেদান্ত দর্শনে মন বুদ্ধি চিত্ত অহংকার ইত্যাদি এবং বৌদ্ধ দর্শনে পঞ্চস্কন্ধ মানুষের শরীর ব্যতীত আরেক অস্তিত্বের সঙ্গতিপূর্ণ ব্যাখ্যা অবশ্যই করেছে। কিন্তু সে সঙ্গতি দর্শনের সঙ্গতি, অবজেক্টিভ জগতের নয়। হাসপাতালের নিউরোসাইন্সের বিভাগে গেলে যে সমস্ত রোগ ও রোগীর অভিজ্ঞতা হয় তার সুরাহা কোন বেদান্ত দর্শনে কোন বৌদ্ধ দর্শনে নেই। দর্শন মানুষকে কোথাও একটা সান্ত্বনা দিতে পারে কিন্তু তার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির রাস্তা বিজ্ঞানই দিতে পারে। বিজ্ঞানের সাইকোলজ, সাইক্রিয়াটিক ও নিউরোলজি ডিপার্টমেন্ট কোন দার্শনিক সিদ্ধান্তের উপর দাঁড়িয়ে নেই। দীর্ঘদিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তার সিদ্ধান্তের উপর দাঁড়িয়ে। দর্শনের সুবিধা হচ্ছে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপর নির্ভর করে না। তাকে স্বীকার করলে হয়, তা নিয়ে সৌখিন তর্কাতর্কি চলতে পারে, সে নিয়ে মনোহর ব্যাখ্যা চলতে পারে কিন্তু কখনোই তাকে বাস্তবের জগতে বাস্তবের দুঃখের থেকে ত্রাণের পরিত্রাতা হিসেবে ভাবা যেতে পারে না।

দর্শনের নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, কাব্যময়তা আছে, এবং অবশ্যই সে সব মূল্যবান। কিন্তু যখনই তাকে বিজ্ঞানের প্রতিদ্বন্দ্বী বা অগ্রগামী হিসেবে দেখি তখনই ভুল হয়। ভারতের মাটিতে বহু যন্ত্রণার রাস্তা এই সিউডোসায়েন্স প্রশস্ত করে রেখেছিল একসময়। সাপে কাটার জন্য ওঝা, বসন্ত রোগের জন্য শীতলা এমন আরো নানাবিধ ভ্রান্ত উপায় ছিল সেদিন। সেই একই জিনিস যখন আজ নানা রকম টার্মিনোলজি, বুদ্ধি সম্মোহক ব্যাখ্যায় বাজারে বিকোচ্ছে, মানুষ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে শুনতে যাচ্ছে তখন তা অবশ্যই ভয়ের। এবং এ কথা লিখে দেয়া যেতে পারে, যারা শুনতে যাচ্ছেন, সে সব শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা কোনদিনই দেহ আত্মা আলাদা জানার ভাষণে হাততালি দিয়ে এলেও, ফেসবুকে সে ভিডিও শেয়ার করলেও, সামান্য শারীরিক স্নায়বিক অসুবিধায় কোন বৈদান্তিক দর্শনের ব্যাখায় সান্ত্বনা খুঁজবেন না, মোটা টাকা খরচ করে চিকিৎসকের শরণাপন্নই হবেন। আবার সেই দ্বিচারিতা জন্মাচ্ছে। এর থেকে অনেক গুণ ভালো সেই ভক্ত, যে এসব আলোচনায় না গিয়ে দুবেলা কীর্তন গেয়ে, তার ভাবের ঈশ্বরের সেবায় মগ্ন হয়ে ছদ্মবিজ্ঞানের প্রচারে না গিয়ে নিজের ভাবে নিজে মগ্ন হয়ে আছে। আমি ধর্মীয় কুসংস্কারগত আচার বিচারেও ততটা ভয় পাই না যতটা ভয় পাই বিজ্ঞানের নামে ধর্মের নানাবিধ অপরিণত, ভ্রান্ত দর্শনকে নির্ভুল বলে চালিয়ে দেওয়া। সেটা যত ক্ষতি করে কুসংস্কার ততটা ক্ষতি করে না। তার মানে এই নয় আমি কুসংস্কারের পক্ষে বলছি। আমি ছদ্ম বিজ্ঞানকে ভয় পাই। আর যারা সেটা সুললিতভাবে, সুন্দরভাবে উপস্থাপনা করেন তাদের আরও ভয় পাই।