Skip to main content

 

"Be educated, be agitated, be organised, be confident, never give up, these are the five principles of our life" ~ BR Ambedkar

দেওয়াল শূন্য যেমন ঘর হয় না, তেমনই সংস্কার শূন্য মানুষ হয় না। একটা পরিবারে, সমাজে জন্মে তার বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এক জাতের সংস্কার তাকে গড়ে তোলে। প্রতি ব্যক্তির মতো প্রতিটি সমাজের একটা সংস্কার আছে। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি তার একটা অংশ। সেই সংস্কারেই এক জাত আরেক জাত থেকে আলাদা হয়, বৈচিত্র আসে। সংস্কার 'কু' আর 'সু' দুই-ই হয়। আবার সেই 'কু' আর 'সু'-এর সংজ্ঞাটাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়।

বৃদ্ধি আর বিকাশ ব্যক্তির জীবনে আর সমাজের জীবনে থমকে দাঁড়ালে সেটা ভালো লক্ষণ না। ভয় আর অন্যায্য ভক্তি দুই-ই নানা সময়ে এই বৃদ্ধি আর বিকাশের রাস্তায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভারতে যখন ভক্তি আন্দোলন হয়েছিল তখন এই ভয়-ভক্তির জড়তা থেকে মুক্তির কথাই সেদিন বলা হয়েছিল। ভক্তি আন্দোলনে যে ভক্তির কথা বলা হল সে খানিকটা পাশ্চাত্যের ফরাসী বিপ্লবের মত। পুরোহিত, শাস্ত্র, রাজা ইত্যাদির চোখ রাঙানির বাইরে ভক্তের হৃদয় বিবেক দ্বারা সিঞ্চিত ভক্তি অশ্রুতে ভগবান সাড়া দেন সহজে এমন একটা কথা জোরের সঙ্গে বলা হল। ভগবান আর তোমার মধ্যে কোনো তন্ত্র নেই, এমন একটা সত্যকে বড় করে দেখা হল। অনেক ঐতিহাসিকের মতে ইসলামের একেশ্বরবাদ, বর্ণাশ্রমহীন সমাজব্যবস্থা ও সুফী এই আন্দোলনকে জাগিয়ে তুলেছিল।

আমরা যখন বলি সংস্কার মুক্ত মন, তখন কী বুঝি তবে? তখন বুঝি সংকীর্ণতা মুক্ত মন। সংস্কার যেখানে পথ না হয়ে পাঁচিল হয়ে উঠেছে সেখানে সে সেই সংস্কারকে মানতে অস্বীকার করেছে। সমস্যাটা তখনই শুরু হয় যখন যে কোনো সংস্কারকে আমি সংস্কার হিসাবে না দেখে তাকে ধ্রুব সত্য হিসাবে দেখতে চাই। শুধু তাই নয়, কোনো একটা সংস্কারের সঙ্গে আত্ম-পরিচয়কে এক করে দেখে সেই সংস্কারকে চিরকালীন সত্য প্রচার করে নিজে চিরকালীন আসন পেতে চাই। এর ফল কোনো জাতের পক্ষে, কোনো মানুষের পক্ষেই তা ভালো হয়নি।

শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অনুভবে মন ধোপাঘরের কাপড়। ধোপার কাছে কাপড় কখন দিই? যখন কাপড় ময়লা হয়, তার রঙ মলিন হয়ে আসে। “এই মলিনবস্ত্র ছাড়তে হবে, হবে গো এইবার, আমার এই মলিন অহংকার”। কিন্তু এ তো গেল ব্যক্তি মানুষের মনের কথা, তার সংস্কারের কথা। সমাজের যে মিলিত মন, সমাজের অবচেতনে জেগে থাকা যে সংস্কার? সেখানে সাধনের থেকে বড় শব্দ শিক্ষা।

প্রাচ্য সাধনকে বড় করে দেখেছে, পাশ্চাত্য শিক্ষাকে। প্রাচ্য বলেছে সাধনের মাধ্যমে তুমি যুগান্তরের সঞ্চিত সংস্কাররাজি পুড়িয়ে ফেলে মুক্ত হয়ে ব্রহ্মে লীন হয়ে যেতে পারো। পাশ্চাত্য বলেছে সাধনের কথা আমি অত জানি না, ব্যক্তির মুক্তি, নির্বাণ ইত্যাদিও আমার ভাবার জায়গা নয়, আমি জানি শিক্ষাকে যদি সার্বজনীন স্তরে আনা যায় তবে মনের অনেক অন্ধ সংস্কার আপনিই খসে পড়ে।

প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যে দুই ধারা তৈরি হল। একদিকে তৈরি হল গুরুকূল, আরেকদিকে তৈরি হল স্কুল। ক্রমে সেদিকে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা নানা শাখায় প্রভাব বিস্তার করল। আমাদের আত্মবিদ্যা, ব্রহ্মবিদ্যা, শাস্ত্রালোচনা যুগের সঙ্গে সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে লুপ্ত হতে শুরু করল। সেদিন প্রাচ্যে ছিলেন গুরু। কারণ অতীন্দ্রিয় বিদ্যায় একজন অথোরিটি আবশ্যিক। তাই গুরু হলেন প্রশ্নাতীত, ঈশ্বরতুল্য। আবার অনেক মতে ঈশ্বরের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। পাশ্চাত্য শিক্ষাপদ্ধতিতে আনল শিক্ষক, প্রশিক্ষক - টিচার/ ইনস্ট্রাকটর। তারা প্রশ্নাতীত নন। তারা সে অর্থে অথোরিটিও নন। পাশ্চাত্য হাতে-কলমে পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব দিল। ভারত ধ্যানে, যোগে, স্মরণশক্তির বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিল।

ইংরেজরা আসার পর আমাদের শিক্ষা সংক্রান্ত চিন্তা বদলালো। অবশ্যই সেখানে ইংরেজদের থেকে ইংরেজি পড়া ভারতীয় মনীষীদের অবদান যথেষ্ট। না হলে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় 'কাজের মানুষ'-এর বাইরে শিক্ষিত মানুষ গড়ার তাগিদ কতটা ছিল সেটা অবশ্য আজ সবার জানা। ভারতের কয়েকজন মনীষী সেদিন বললেন, ভারতীয় চিন্তায়, বোধের গভীরতার সঙ্গে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানকে মেলাতে না পারলে সমূহ বিপদ। শান্তিনিকেতন তার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। কলোনিগত যুগে ভারতের কয়েকটি শিক্ষাপদ্ধতি মোক্ষমার্গীতায় না, দেশপ্রেমমার্গী নিজেদের পথ তৈরি করতে চাইল। রবীন্দ্রনাথ এর ব্যতিক্রম ছিলেন অবশ্যই। দেশপ্রেমের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাবাদী শিক্ষায় তিনি শান্তিনিকেতনকে দাঁড় করাতে চাইলেন। বিবেকানন্দ, মহাত্মা প্রমুখ ভারতীয় ধর্মের যারাই প্রচার করতে চাইলেন তারা এই দিকটাই গুরুত্ব দিলেন, মানবতাবাদ। সেদিন ভারতবর্ষকে নতুন করে খোঁজার একটা তাগিদ শুরু হল। হয় তো রামমোহন এর সূত্র ধরিয়ে দিলেন বলা যায়। ভারতের মাটিতে ভারতের দর্শনকে বিশ্বের নানা ধর্ম-দর্শন সম্বন্ধে তাঁর নিবিড় পাঠজাত অগাধ পাণ্ডিত্যের আলোয় দেখে অন্যভাবে ভাবতে চেষ্টা করলেন। আরো বেশি উদার, যুক্তিগ্রাহ্যতায় আনার চেষ্টা করলেন। তৈরি হল একধারার নবজাগরণ। শিক্ষা ভাবনাতেও লাগল নতুন ঢেউ।

দেশপ্রেম দেশকে সত্য অর্থে জানা ব্যতীত হয় না। একজন মানুষের হৃৎপিণ্ড খুব ভালো চলছে বলে তার যকৃৎ কিম্বা ফুসফুসের ত্রুটিকে অগ্রাহ্য করার মধ্যে অবিবেচনা আছে, মানুষটার উপর প্রেম অন্তত নেই। বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ এই অর্থে দেশকে জেনেছিলেন, জানাতে চেয়েছিলেন। ভালো-মন্দ দুটোকেই যদি স্পষ্টভাবে না জানা যায় তবে কোনো মানুষকে, জাতকে সম্যক জানা হয় না। সেটা আর যাই হোক প্রেম অন্তত না। সঙ্গে বেশ কয়েকজন অভারতীয় দরদী মনীষীর জন্য ভারতের অতীতের নানা অধ্যায়ও জ্ঞানের আলোয় ধরা দিল। বুদ্ধকে যে সারা বিশ্ব আবার নতুন করে চিনল সেও এই সময়ের আলোকপাতেই।

আজ আধুনিক শিক্ষা বলতে যা বুঝি তা পাশ্চাত্যের education system-এরই ভারতীয় সংস্করণ। যদিও আমাদের ডগম্যাটিক অ্যাপ্রোচ থেকে, অর্থাৎ মুখস্থসর্বস্বতা থেকে বেরোতে এখনও অনেকটা রাস্তা বাকি, তবু এটুকু বোধে এসেছে যে শিক্ষায় ক্রিটিকাল থিংকিং, হাতে-কলমে শিক্ষার ভূমিকা অনেক বেশি। অন্তত সেগুলোর গুরুত্ব যে মুখস্থ বিদ্যার চাইতে বেশি সেটা আমরা বৌদ্ধিক স্তরে অন্তত স্বীকার করতে শুরু করেছি। এখানে স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন আসে, নালন্দা, তক্ষশিলা, দাক্ষিণাত্যের মন্দির কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতা থাকল না কেন? সেখানেও তো ধাতুবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা ইত্যাদির পাঠের ব্যবস্থা ছিল। সেই সব ধর্মকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেকুলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠল না কেন? শুধুই কি বিদেশী আক্রমণ? জ্ঞানের গোপনীয়তা, বর্ণাশ্রমভেদে জ্ঞানের অধিকারী নির্ণয় ইত্যাদিও কি কারণ ছিল না? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কতটা পরিবর্তনশীল ছিল আমাদের শিক্ষার দিকে ঝোঁক? এক আছে পরীক্ষিত সত্য, আরেক আছে অপরীক্ষিত সত্য আর আছে পরীক্ষার আওতার বাইরের বিশ্বাস। আত্মা, ঈশ্বর, পরলোকচর্চা অবশ্যই তৃতীয় ঘরে পড়ে। তাই নিয়ে হাইপোথিসিস, থিওলজির পর থিওলজি উঠতে পারে, কিন্তু তারপর? আজ কেন 'ভারতীয়ত্ব' নিয়ে এত তর্ক? সে ভারত কতটা পৌরাণিক, কতটা ঐতিহাসিক? মূল পার্থক্য হল শিক্ষায়। কেন বিশ্বকর্মা এখানে নির্দিষ্ট তিথিতে পুজো নিয়ে বাকি সময়টা নিজের সমস্ত ঐশ্বর্য উজাড় করে ওদিকে ঢেলে দিলেন, তার কারণ শুধুই শিক্ষা ব্যবস্থার পার্থক্য। ভারত আজ ধ্যানের, অধ্যাত্মিকতার, ধর্মের কেন্দ্র হিসাবে দেখাতে চাইছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই চাহিদাগুলো সার্বজনীন কোনোদিন হতে পারে না। স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান, রাস্তাঘাট, পরিধান ইত্যাদি নানাবিধ জিনিসের চাহিদা সার্বজনীন। তাই জগতে বিশ্বগুরুর চাইতে সার্বজনীন শিক্ষার সমানাধিকারের প্রয়োজন সব চাইতে বেশি। করোনা বুঝিয়েছিল মন্দির বন্ধ হতে পারে, কিন্তু হাসপাতাল না।

আজ শিক্ষা আর শিক্ষাপদ্ধতি আবার আলোচনার কেন্দ্রে। আবারও অর্ধসত্য, স্বার্থবুদ্ধিপ্রণোদিত বাস্তবের খণ্ডাংশকে পূর্ণতার মর্যাদায় অভিষেকিকরণের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তাকে রুখে দাঁড়ানোর শক্তিও জন্ম নিয়েছে। শিক্ষাকে যতক্ষণ না সভ্যতার, গণতন্ত্র রক্ষার মূল চালিকাশক্তি বুঝতে শিখব ততদিন ক্ষমতাশালীর করুণা ভিক্ষা করা ছাড়া পথ থাকবে না। আম্বেদকর এটা বুঝেছিলেন। তাই শিক্ষাকে নিজের প্রধান অস্ত্র করেছিলেন যুগান্তরের অন্ধকারের মূলে আঘাত করার।

শিক্ষা শিক্ষকের উপর নির্ভর করে না। শিক্ষাদান শিক্ষকের উপর নির্ভর করে। কারোর দানসামগ্রীর কার্পণ্য থাকায় যেন মনে না হয় শিক্ষার রত্নভাণ্ডারের দৈন্য সেটা। শিক্ষার কোনো সংস্কার নেই। শিক্ষা সার্বজনীন। শিক্ষা মোহমুক্ত যত হবে ততই শক্তিশালী হবে। শিক্ষক আর শিক্ষার্থী জ্ঞানের চর্চায় যত উন্মুক্ত মনে বসবেন ততই সভ্যতার ভিত, গণতন্ত্রের ভিত পাকা হবে। গণ আর উন্মত্ত জনতার (mob) মধ্যে পার্থক্যটা শিক্ষার। এটা মনে রাখতে হবে। শিক্ষা কোনো মতের দাস নয়, শিক্ষা সত্যের দূত।

↑