৯ই ডিসেম্বর, ১৮৮৩। শ্রীরামকৃষ্ণ ও মাষ্টারমশাই কথা বলছেন একান্তে। মাষ্টারমশাই বলছেন, “সব চুকে গেলে এই স্থান মহাতীর্থ হবে”।
২৩শে অগস্ট, ১৮৯৬ স্বামীজি চিঠি লিখছেন, গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দকে।
“বেশ্যারা যদি দক্ষিণেশ্বরের মহাতীর্থে যাইতে না পায় তো কোথায় যাইবে? পাপীদের জন্য প্রভুর বিশেষ প্রকাশ, পুণ্যবানের জন্য তত নহে।
মেয়ে পুরুষ-ভেদাভেদ, জাতিভেদ, ধনভেদ, বিদ্যাভেদ ইত্যাদি নরক-দ্বাররূপ বহুভেদ সংসারের মধ্যেই থাকুক। পবিত্র তীর্থস্থলে ঐরূপ ভেদ যদি হয়, তাহা হইলে তীর্থ আর নরকে ভেদ কি?
আমাদের মহা জগন্নাথপুরী-যথায় পাপী-অপাপী, সাধু-অসাধু, আবালবৃদ্ধবনিতা নরনারী সকলের সমান অধিকার। বৎসরের মধ্যে একদিন অন্ততঃ সহস্র সহস্র নরনারী পাপবুদ্ধি ও ভেদবুদ্ধির হস্ত হইতে নিস্তার পাইয়া হরিনাম করে ও শোনে, ইহাই পরম মঙ্গল।
যদি তীর্থস্থলেও লোকের পাপবৃত্তি একদিনের জন্য সঙ্কুচিত না হয়, তাহা তোমাদের দোষ, তাহাদের নহে। এমন মহা ধর্মস্রোত তোল যে, যে জীব তাহার নিকট আসবে, সেই ভেসে যাক।
যাহারা ঠাকুরঘরে গিয়াও ঐ বেশ্যা, ঐ নীচ জাতি, ঐ গরিব, ঐ ছোটলোক ভাবে, তাহাদের (অর্থাৎ যাহাদের তোমরা ভদ্রলোক বলো) সংখ্যা যতই কম হয়, ততই মঙ্গল। যাহারা ভক্তের জাতি বা যোনি বা ব্যবসায় দেখে, তাহারা আমাদের ঠাকুরকে কি বুঝিবে? প্রভুর কাছে প্রার্থনা করি যে, শত শত বেশ্যা আসুক তাঁর পায়ে মাথা নোয়াতে, বরং একজনও ভদ্রলোক না আসে নাই আসুক। বেশ্যা আসুক, মাতাল আসুক, চোর-ডাকাত সকলে আসুক-তাঁর অবারিত দ্বার। 'It is easier for a camel to pass through the eye of a needle than for a rich man to enter the kingdom of God." এ সকল নিষ্ঠুর রাক্ষসীভাব মনেও স্থান দিবে না।”
শ্রীমা সারদার কাছে কথা উঠেছে, অনেক বেশ্যা, পতিতা মায়ের কাছে আসে বলে ভদ্রপরিবারের মহিলারা আসতে সঙ্কোচ করেন। মা যেন তাদের আসতে বারণ করে দেন। মা তৎক্ষনাৎ উত্তর করলেন, ভদ্র পরিবারের মেয়েদের যাওয়ার অনেক জায়গা আছে, কিন্তু এদের যাওয়ার আর জায়গা নেই, তিনি বারণ করলে তারা যায় কোথায়? তিনি বারণ করবেন না। তাতে করে ভদ্র পরিবারের মেয়েরা না আসে, না আসুক।
গিরিশ ঘোষের সঙ্গে বারবণিতারা আসতেন ঠাকুরের কাছে। এমনও আছে সারারাত ঠাকুর তাদের সঙ্গে কীর্তনে মেতেছেন। এ কথা কয়েকজন ‘পণ্ডিত মানুষ’ বিদেশে প্রচারের চেষ্টা করেন ঠাকুরের চরিত্র কালিমালিপ্ত করার জন্য। রোমা রোঁলার মত মানুষ কলম ধরেন। বলেন, এটা নিন্দার কারণ হলে জগতের অনেক মহাপুরুষই শ্রদ্ধাভাজন হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন।
আজ উৎসবের দিন। বুদ্ধিবিচার ক্ষুরধার হলেও মনের সঙ্কীর্ণতা ঘোচে কই? মনের সঙ্কীর্ণতা ঘোচে মহতের শরণাগত হল। মহতের চরিত্র অনুধ্যানে। সংসারে ভালো মন্দ, দয়া নিষ্ঠুরতা, সারল্য জটিলতা সব আছে। এক এক চরিত্রে এক একভাবের রঙ ফুটে ওঠে। সংসারে ঘরে বাইরে প্রতিদিনের হাজার একটা ঘটনায় মনে গ্লানি জমে ওঠে। বিন্দু বিন্দু জমতে জমতে মনের মধ্যে পাহাড় তৈরি করে। গ্লানির ভার যত জমে চলায় ক্লান্তি আসে তত বেশি। বাইরে নিজেকে যতই ধোপদুরস্ত কেতাদুরস্ত করে রাখি, মনে মনে বুঝি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছি ভিতরে ভিতরে। গ্লানির ক্লেদে মাখা গোটা অন্তঃকরণ। যেখানে যত ভেদভাব গ্লানি সেখানে তত বেশি। উচ্চমতাদর্শ, সভাসমিতি, ভাষণ, ধর্মীয় বিশ্বাস অবিশ্বাস কিছুতেই সে ঘোচে না। ঘোচে এমনসব চরিত্রের অনুধ্যানে। সেদিন উৎসব সার্থক হয় যেদিন খোলা বাতাসে চিত্ত আবার সতেজ হয়। এই সব আলোকিত চরিত্রের দিকে চিত্তের যাওয়াই আসল তীর্থ। নইলে শরীরটা ট্রেনেবাসে চড়িয়ে এদিক ওদিক দৌড় করিয়ে বৃথা লাভ কী?
একজন তীর্থে যাবে মনস্থির করেছে। ঠাকুর তাকে হেসে বলছেন, কী, প্রেমের অঙ্কুর হতে না হতেই যাচ্ছ?
প্রেমের অঙ্কুর!! কী কথা! অঙ্কুর যেমন পাষাণ ভেদ করেও যায়, প্রেমও তেমন। ভেদাভেদের শতাব্দী প্রাচীন প্রস্তর ভেদ করে যেতে পারে।
চিত্তের শুষ্ক বীজ তাঁর আঙিনায় গিয়ে পড়ুক। করুণাধারায় সে বীজে অঙ্কুর জন্মাক। প্রেমের অঙ্কুর। এই প্রার্থনা।