শ্রাবণের প্রথমদিন। আকাশ জুড়ে সমুদ্রের জলের লিপি। বাষ্পীয় লিপি। একটা পাখি এত বড় আকাশকে, এমন সজল রাজকীয় মেঘকে তোয়াক্কা না করে কয়েকটা খড়কুটো মুখে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটা বটগাছের দিকে। আশ্রয় বানাবে। যে গাছ মাটির গভীরে শিকড় বিছিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যুগান্ত ধরে, তার হাতের উপর নিজের জীবন রেখে বলবে, আমাকে আশ্রয় দাও। আমার অনন্তকাল নেই, আমার আকাশের দিগন্তলীন অসীমত্ব নেই। আমার আছে কালের কয়েক মুহূর্ত। আছে খুব ছোটো ছোটো কিছু স্বপ্ন, ব্যথা, আশা, আনন্দ। এতই তুচ্ছ তারা যে এই খড়কুটো ঘেরা ঘর ছাড়া আর মর্ম কেউ বুঝবে না। সে ঘরকে তুমি রাখলে থাকে, না রাখলে যায়।
গাছ দিল আশ্রয়। সে বাঁধল নীড়। একদিন আকাশ অনেক রাতে নেমে এলো তার নীড়ের পাশে। ততদিনে তার নীড়ে তিনটে ডিম হয়েছে। সে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে বসেছিল।
আকাশ নেমে এসে বলল, দেবতারা তোমার জন্য আকাশের পারে অপেক্ষা করছেন। তুমি অমরত্বের অধিকারী। তুমি এই মায়া থেকে জাগো। এসো।
পাখি বলল, তুমি এই ডিমে নিজের শরীরের উষ্ণতা বিছিয়ে দিতে পারো? পারো ওর জন্য প্রতিদিন খাবার জোগাড় করে আনতে? ওর না ফোটা দুটো চোখের উপর চোখ রেখে ওকে দুনিয়ার গল্প বলে যেতে পারো? পারো ওদের জন্য দুশ্চিন্তায় রাত কাটাতে?
আকাশ বলল, এগুলোই তো মায়া! এরা কি তোমার? না। তুমি সামান্য অবোধ জীব। বোঝো। এসো। চলো সাধনায়।
পাখি বলল, দেবতাদের বোলো, আমার এ মায়াকে যে বোধ সত্য বলে জানে, সে বোধের উৎস কী?
আকাশ হাসল। বলল, এর উত্তর আমি জানি। তার জন্মদাতা হল ভ্রম।
পাখি বলল, ভ্রম? সে বোধ ভ্রম? এত বড় সৃষ্টি শুধুই ভ্রম
আকাশ বলল, হ্যাঁ।
পাখি বলল, ইচ্ছা কি সেই ভ্রম ছাড়া জাগে?
আকাশ বলল, না। সত্যের আলোর সে জগতে ইচ্ছা বলে কিছু হয় না।
পাখি বলল, তাই “আমি” বলেও কিছু হয় না সেখানে।
আকাশ বলল, হ্যাঁ।
পাখি বলল, ভোর হতে চলল, আমি না ডাকলে সে শুধু সত্যই হবে, মাধুর্যহারা, তুমি যাও। আমি ডাকি, এই আমার ইচ্ছা। তোমার নেই। তোমার দেবতাদের ইচ্ছা নেই। আমার আছে। যাও তুমি।
আকাশ ফিরে গেল। বলে গেল, সে ইচ্ছার শেষ আছে যেন। তাই সে মিথ্যা।
পাখি বলল, সে শেষ হবে বলেই সে আমার সত্য। শেষ না হলে হত তোমাদের সত্য। আমি বাঁধা পড়তাম।