বউমা যখন ভাতের থালা এগিয়ে দিয়ে বলল, আর কিন্তু বসিয়ে খাওয়াতে পারব না, পরিবারে লোক বাড়ছে, আবার আগের মত কাজে বেরোও তুমি…..
তখন বেলা বউমার মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকল কিছুক্ষণ। বউমা গর্ভবতী বুঝল। কিন্তু কাজে যেতে হবে আবার? যৌবনে পাঁচ ছয় বাড়ি ঠিকে ঝিয়ের কাজ করেছে। কিন্তু এখন তো পারে না আর। সর্বাঙ্গে বাতে ব্যথা। ঠাকুমা হতে চলেছে বলে খুশি হবে, না আবার সেই আগের জীবনে ফিরতে হবে এই বাতের শরীর নিয়ে বলে কষ্ট পাবে….বুঝল না। ডাল ভাত আর পটলের তরকারি দিয়ে ভাত ক'টা গিলে ঘরের শাড়িটা পরেই রাস্তায় এসে দাঁড়ালো।
======
বেলার বর মারা গেছে বহুকাল। তখন ছেলের আট বছর বয়েস। অবিনাশ বহুবার তাকে বলেছে সে তার ছেলের দায়িত্ব নিতে কার্পণ্য করবে না, বিয়ে করতে তাকে। কিন্তু বেলার মন কোনোদিন অবিনাশকে চায়নি। ওদের পরিবার মাতালের পরিবার। তিন ভাই মাতাল। বাবাটাও তাই ছিল। বড়ভাই তো জেলও খেটেছে।
কিন্তু আজকে অবিনাশের কথাই মনে পড়ল। অবিনাশের স্ত্রী পক্ষাঘাতে বিছানায় বহুদিন হল। তাকে দেখাশোনা করার একজন মানুষ খুঁজছিল অবিনাশ।
অবিনাশ বারান্দায় বসে বাইকটা মুছছিল যখন বেলা সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। অবিনাশ তাকে দেখেই হাতের ন্যাকড়াটা ফেলে বলল, তুমি?
তোমার বউকে দেখাশোনার লোক খুঁজছিলে না? আমি করব।
এই কথাটা সারাটা রাস্তা মনে মনে বলতে বলতে এসেছে বেলা। এখন সেটাই ছুঁড়ে দিল।
অবিনাশ বলল, কেন?
বউমা বলেছে না কাজ করলে খাওয়া নেই….
হাসার চেষ্টা করল বেলা।
অবিনাশ বলল, ছাওয়ায় এসে বোসো।
আষাঢ় মাস। রোদ চড়া। ভ্যাপসা হয়ে আছে। পাশের ঝোপ থেকে কিছু বুনোফুলের গন্ধ আসছে।
বেলা বারান্দায় উঠে এলো। বসল চেয়ারে। বড্ড সংকোচ হচ্ছে। মনে মনে ভাবছে এই এক কাপড়ে বৃন্দাবন কী কাশী চলে যায়। কিন্তু জানে শরীর দেবে না। আর শরীর না দিলে মিথ্যা গুমোর রেখে কী হবে? অপমানিত যদি হতেই হয় তবে একদিন যাকে ফিরিয়েছিল তার কাছেই হবে। কোথাও শোধবোধ হয়ে যাবে।
অবিনাশ দাঁড়িয়ে। বলল, তোমার যা শরীর, পারবে?
বেলা অবিনাশের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, পারতেই হবে। তুমি কী চাও ভিক্ষা করি জীবনের এই শেষ বেলায় এসে স্টেশানে? দেখতে পারবে?
শেষ কথাটা বলার দরকার ছিল না। নিজেকে নির্লজ্জ লাগল।
অবিনাশকে কিছুটা বিব্রত লাগল। বলল, তুমি আজ বাড়ি যাও। আমি ওর সঙ্গে কথা বলে দেখি।
=======
বেলা কোনোদিন ভাবেনি পাপিয়ারও একটা মতামত থাকতে পারে। অবিনাশের উপর তার একটা দাবী যেন আছেই। কিন্তু সেই দাবীর উপর যে কারোর দস্তখত লাগতে পারে, এটা সহ্য হল না বেলার।
সন্ধ্যেবেলা কয়েকবাড়ি গেল। কাজও পেল। বেলা কাজে যাওয়া শুরু করল। কিন্তু একবেলা। অবিনাশ তাকে এড়িয়ে যায় এখন। বেলার মাথা গরম হয়ে যায় অবিনাশকে দেখলে। শাপশাপান্ত করে।
উল্টোরথের দিন পাপিয়া মারা গেল। বেলা শুনল কাজের বাড়ি বসেই। বাসন মেজে, ঝাঁট দিয়ে, কাপড় কেচে অশক্ত শরীরটা নিয়ে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে বড় দীঘির পাড়ে গিয়ে বসল। নিজেকে অপরাধী কেন লাগছে? এত নীচ তো লাগেনি নিজেকে কখনও।
বেলা দুপুরে বাড়ি ফিরল না। খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। নিজের মৃত্যুর স্বপ্নে বিভোর হয়ে গোটা দুপুর কাটিয়ে দিল। কে কে কাঁদবে। কে কে আসবে। কী কী কথা বলবে তাকে নিয়ে। বারবার অবিনাশের ছলছল চোখটা কল্পনা করল। সুখ পেল। কিন্তু আজ কি ও কেঁদেছে? আজকের কান্নাটা ফাঁকি। লোক দেখানো। বেলা নিজেকে বলল, নির্লজ্জ।
======
অবিনাশ গ্রাম ছেড়ে গেল কাউকে কিছু না জানিয়ে। বাড়ি কবে বিক্রি করেছে কেউ জানতে পারেনি। সে বাড়িতে দুদিনের মধ্যেই নতুন লোক এসেছে। দুটো ছোটো ছোটো বাচ্চা রাতদিন ওদের বাড়ির সামনে খেলে বেড়ায়।
বেলার রাতদিন একটা অপমান, ঠকে যাওয়া অনুভব হয়। অন্য কেউ ঠকালে তার সঙ্গে রফা করা যায়। কিন্তু নিজেকে নিজে ঠকালে?
একদিন কাজ থেকে ফিরে শুনল অবিনাশের বাড়ি থেকে তার খোঁজ করে গেছে কেউ।
বেলার কথাটা ভালো লাগল না খারাপ লাগল বুঝল না। গেলো।
দরজা খুলল বউ একজন। বাড়ির ভেতর আসতে বলল। এই প্রথম বারান্দা পেরিয়ে ঘরে ঢুকল বেলা এই বাড়ির। পাপিয়া কোন ঘরে শুতো?
তাকে চেয়ারে বসতে বলে বউটা খাটে বসল। কথা শুরু হল।
ওদের বাচ্চাগুলোকে দেখাশোনার লোক চাই। বউটা আবার গর্ভবতী। ডাক্তার বলেছে রেস্টে থাকতে। কিছু সমস্যা আছে।
বেলা জিজ্ঞাসা করল, অবিনাশদা কোথায় আছে এখন?
কে জানে? বউকে নাকি এমন ভালোবাসত যে এ বাড়িতে থাকা অসহ্য হয়ে গিয়েছিল তার। জলের দরে এ বাড়ি দিয়ে গেল। নইলে ওর ক্ষমতা আছে নাকি এ বাড়ি কেনার? এমন ভালোবাসা সিনেমায় দেখেছি….বাস্তবে হয়? কী দিদি?
হাসছে বউটা। বেলার ঘাম হচ্ছে। বুকটা ধড়ফড় করছে। বলল, আমি উঠি।
কিছু বললেন না যে দিদি……
বেলা শুনতে পেলো না। এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে শাঁখের আওয়াজ আসছে। বউমার সীজার হবে আশ্চে সপ্তাহে। হোক বাত তার সারা শরীর জুড়ে। মরুক সে। এই বাসন মাজতে মাজতেই মরবে লোকের বাড়ি। নাকি চলে যাবে যেদিকে দুচোখ যায়। একা রাস্তায় মরে পড়ে থাকবে। সেই বেশ হবে।
বাড়ি এসে শুনল বউমা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় হাসপাতালে নিয়ে গেছে তাকে ছেলের বন্ধুরা। ছেলেও আসছে। খবর দেওয়া হয়েছে।
বেলার এক মুহুর্তের জন্য ভীষণ অভিমান হল। তাকে কেউ কোনো খবর দেয় না কেন? তারপরই তার কাছে যা টাকা ছিল নিয়ে দৌড়ালো।