মানুষের যতদিন বিজ্ঞান ছিল না, ততদিন শুধু মত-ই মানুষের একমাত্র উপজীব্য ছিল। মানুষের চিন্তা ক্ষমতা আছে। আর আছে বলেই তার মতামত তৈরির ক্ষমতা আছে। ভারতীয় দর্শনের এক বিশেষ শাখায় মনকে সঙ্কল্প-বিকল্পত্মক এই জন্যেই বলা হয়েছে যে সে মতামত তৈরি করতে পারে। সেই শাখাতেই বুদ্ধিকে বলা হয়েছে নিশ্চয়াত্মিকা, অর্থাৎ বুদ্ধি স্থির করতে পারে কোনটাকে সে বেছে নেবে। কিন্তু এরা সবাই ভ্রমাত্মক হতে পারে। নির্দিষ্ট করে সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা এদের দুজনেরই নেই।
বিজ্ঞানকে জানার বিজ্ঞানবোধ যখন মানুষের মধ্যে জন্মালো তখন সে বুঝল তার বুদ্ধির মধ্যেই এমন এক তন্ত্র আছে যার মধ্যে বিশ্বের তন্ত্রের প্রতিফলন হয়। বিজ্ঞান ছাড়া সাধারণত্বের তত্ত্বকে এমন করে আর কে এত স্পষ্ট করে বোঝালো মানুষকে? আমি যোগ করলেও দুই আর তিনে পাঁচ হয়, আর বিশ্বের প্রবল ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ যোগ করেলেও তাই হয়। আমার শরীরের গঠনের সাধারণ ধাঁচার সঙ্গে এই পৃথিবীর সব মানুষের শরীরের ধাঁচা এক। এ বিজ্ঞান ছাড়া কে শেখালো আমাদের?
এই সাধারণত্বের সত্যকে বিজ্ঞান যত স্পষ্ট করে তুলল তত অসাধারণত্বের সীমানা খাটো হতে শুরু করল। বিজ্ঞান প্রথম স্পষ্ট করে বোঝালো সাধারণত্বই এ বিশ্বের সত্যের মূলগত শর্ত। ব্যতিক্রম ক্রমকেই স্পষ্ট করে, ক্রমকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে না। কারোর হাতে পাঁচটা আঙুলে ব্যাখ্যা যেমন আছে, তেমনই ছটা আঙুলের ব্যাখ্যাও আছে। যার ছটা আঙুল সে অসাধারণ নয়, ব্যতিক্রম।
সাধারণত্বের হাত ধরে আরেকটা শব্দকে বিজ্ঞান চেনালো। বৈচিত্র। ডাইভারসিটি। জীবনের সত্য সাধারণত্বে। জীবনের আনন্দ বৈচিত্র্যে, একঘেয়েমিতে নয়। আনন্দ যেখানে সেখানে বৈচিত্র্য থাকবেই। ভয়, শোষোণ, পীড়ন যেখানে সেখানে বৈচিত্র্যের নামগন্ধ নেই। যার রান্নার শখ সে প্রতিদিন একই পদ সে রাঁধে না। যার বাগানের শখ সে গোটা বাগান শুধু একটা ফুলগাছেই ভরিয়ে রাখে না। যে বেড়াতে ভালোবাসে সে বছরে বছরে একই জায়গায় পড়ে থাকে না। যেখানে যত বেশি এই বৈচিত্র্যের প্রকাশ বুঝতে হবে সে মানুষটা, সে সমাজটা তত স্বাস্থ্যবান।
কিন্তু মানুষের প্রবৃত্তিতে শুধু তো সত্যস্পৃহা, জ্ঞানস্পৃহা, আনন্দস্পৃহা নেই। যা স্বাস্থ্যকর শান্তির নানা প্রকাশ। মানুষের প্রবৃত্তিতে বৈরিতা আছে, লোভ আছে, ঈর্ষা আছে, প্রবল অহমিকার আস্ফালান আছে, উগ্র ক্রোধ আছে। এ সবও তো আছে। আর এ সবের কারণ হল মোহ বলে একটা বস্তুর স্থায়ী বাসও তো আছে। মোহ কী? মোহ কুয়াশা। মোহ বলতে আমাদের চলতি যে ধারণাটা আছে সেটা অতিকথন। যেন কেউ যত নিষ্ঠুর হবে, শূন্যের পেছনে ধাওয়া করবে, অসীম-অনন্তে বলে চিল্লাতে চিল্লাতে লাফাতে লাফাতে নেচে বেড়াবে কিম্বা চোখ বন্ধ করে বসে থাকবে সেই একমাত্র মোহ ত্যাগ করে সত্যের নাগাল পেয়েছে। বাকিরা শুধুই ঠকে যাচ্ছে। এ ধারণাও মোহ। আরো বড় মোহ। কারণ মোহ নিয়ে মোহকে ভাঙা আরো বেশি শক্ত, যেহেতু সে অনেক গভীরে বাসা বেঁধে থাকে।
মোহের সহজ সমার্থক শব্দ আমার মনে হয় ‘ভুল’। যেখানে যেখানে আমি ভুল, সেখানেই আমার যাবতীয় চেষ্টা, সিদ্ধান্ত, বিশ্বাস, হম্বিতম্বি ইত্যাদি যা কিছু উৎপাতের। এখন এই ভুল জ্ঞানের ভুল, না প্রবৃত্তির ভুল সেটাও দেখার। আমি যদি জানি বসন্তরোগের কারণ মা শীতলা নামক দেবীর ক্রোধ, তবে সেটা জ্ঞানের ভুল। আর যদি জানি যে তোমাকে আঘাত করেই আমার নিজের স্বার্থ কায়েম হবে, তবে সেটা প্রবৃত্তির ভুল। জ্ঞানের ভুলের ভুল হিসাবে থেকে যাওয়া অনেক কারণ আছে, যার প্রধান হল পক্ষপাতদুষ্ট বুদ্ধিবৃত্তি, অলসতা, কম্ফোর্টজোনের হাতছানি ইত্যাদি। আর প্রবৃত্তির ভুলের মূল চালিকাশক্তি হল লোভ। লোভকে উপদেশ দিয়ে ক্ষান্ত করা যায় না, ধ্বংসাত্মক পরিণাম দেখিয়ে ঠেকিয়ে রাখা যায় না, শিক্ষা দিয়ে বশীভুত করা যায় না। লোভকে নাশ করে চেতনা। কিন্তু সেই চেতনাকে জাগিয়ে তুলবে কোন আলো? লোভের বিপরীত শব্দ অনুকম্পা। সহানুভূতি। আত্মকরুণা। কিন্তু এগুলো শুধু শব্দই। লোভকে বশীভূত করতে পারে এমন কোনো শক্তি মানুষের আয়ত্তে নেই। যদি থাকত তবে আজ এতগুলো যুদ্ধের এত এত হত্যালীলার সাক্ষী মানুষ থাকত না।
মানুষ সাক্ষী থেকে যায়। আর কোনো প্রাণীর সাক্ষ্যদানের দায়বদ্ধতা নেই। সাক্ষ্যের এমন ধারাবাহিকতা নেই। মানুষ নিজেই তার লোভের, তার উদারতার, তার জ্ঞানের, তার মোহের, তার সহনশীলতার, তার নিষ্ঠুরতার সাক্ষী। কিন্তু এমন নিরবচ্ছিন্ন সাক্ষী থাকার এতবড় দায়ের বোঝা সে বইবে কী করে একা? তাই তার বোধে একটা বিশ্বাস জেগে থাকে, তার এই সাক্ষী থাকার সাক্ষী হয়ে আরেকজন কেউ নীরব সাক্ষী আছেন। সে সেই সাক্ষ্যের কাছে দরদ চায়, বিচার চায়, করণা চায়। সাক্ষীর বেশে মানুষ সেই নীরব সাক্ষীর দিকে ফেরে। তখন তার সেই ফেরার সাক্ষী সে কাকে রাখে? সময়। তাই সময়ের চাইতে বলবান কেউ নেই। মানুষের আয়ত্তের বাইরে সে। সে নিষ্ঠুর। সে উদাসীন। সে সর্বগ্রাসী। কিন্তু সেই মানুষের ভবিতব্য। সময়ের বাইরে কিছু যদি থাকে তা মানুষের জানার বাইরে। মানুষ ততটুকুই যতটুকুতে সে সাক্ষী। তার বাইরে আর কী? কে জানাবে?
Category
- Log in to post comments
- 1 view