Skip to main content

 

ঐশ্বর্য, না মাধুর্য?

ভোর হল। কিন্তু কুয়াশা কাটেনি। যমুনার জলের উপর ঘন কুয়াশার স্তর। অম্বিকেশ উঠে দাঁড়ালো। গতকাল সন্ধ্যায় সে এসে পৌঁছিয়েছে বৃন্দাবনে। কোনো আশ্রমে যায়নি। মন্দিরে যায়নি। মথুরা স্টেশন থেকে সোজা এসে নেমেছে যমুনার তীরে। রাত বেড়েছে। শীত বেড়েছে। ভরা শ্রাবণের মত যে মেঘের ভার কাশী থেকে ট্রেনে ওঠার সময় জমেছিল বুকের মধ্যে, সে মেঘ রাতের অন্ধকারে ভেঙে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু কোথায় নিয়ে এলো সে?

কুয়াশার মধ্যে থেকে শুনল খঞ্জনির আওয়াজ। কে গায়? তাকে ডাকল সে সুর। আর তো বসে থাকা যায় না। উঠে চলতে শুরু করল। যাওয়ার আগে মাথায় ছোঁয়ালো যমুনাবারি।

আওয়াজ স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ। আলো দেখা যাচ্ছে। মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালো। বাইরে অনেক চটি খোলা। অবিন্যস্ত চটি। যারা এসেছে চটি সাজিয়ে ঢোকার মত মন নিয়ে আসেনি। অম্বিকেশের খালি পা। মন্দিরের প্রথম সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে উঠতে শুরু করল।

নতুন মন প্রশ্ন করল, কার মন্দির?

প্রাচীন মন উত্তর দিল, মন্দির কার হয়? ভগবানের। যিনি আনন্দ, সত্য, চৈতন্য।

নতুন মন বলল, কিন্তু এত ভিন্নতা যে?

প্রাচীন মন বলল, রুচির ভিন্নতা। ভাবের নয়। ধৈর্য ধরো। জীবন মানে ধৈর্যসুখ।

একদল নরনারী কীর্তনে মত্ত। সন্ন্যাসীও আছে। মন্দিরে শ্রীরাধিকার বিগ্রহ। সামনে দুদিকে দুটো বড় প্রদীপ জ্বলছে। কীর্তনের আলোয়, প্রদীপের আলোয় আনন্দময় হয়ে আছে চতুর্দিক।

একজন এগিয়ে এলো অম্বিকেশের দিকে। আপাদমস্তক চাদরে মোড়া এক বৃদ্ধা। কপালে চন্দন দিল। হাতে তুলে দিল করতাল। বলল, গাও। শোক কোরো না। দুশ্চিন্তা কোরো না। গাও।

নতুন মন বলল, সংকোচ লাগে। প্রাচীন মন বলল, আমার আড়ালে যাও।

গাইতে গাইতে অম্বিকেশের মন কাশী বিশ্বনাথের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালো। প্রণাম করে বলল, বাবা, এসো। মা দুর্গার মন্দিরে গিয়ে মায়ের পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে বলল, মা, চলো। সংকটমোচন মন্দিরে মারুতিনন্দনকে আলিঙ্গন করে বলল, এসো, একা কি আমি সব পারি?

এদিকে মন্দিরের মধ্যে তখন রাসমণ্ডল রচনা হয়েছে। অম্বিকেশ পিঠে মৃদু ধাক্কা খেল। সেই বৃদ্ধা। ইশারায় বলল, চারদিকে চেয়ে দেখো, রাধিকাদুলারিকে ঘিরে ঘিরে নাচছে দেখো সবাই। ঘুরবে না? গ্রহ-নক্ষত্র, জন্ম-মৃত্যু, সুখ-দুঃখ সব ঘুরে যাচ্ছে, তুমি ঘুরবে না? না ঘুরলে জীবন ব্যর্থ যে গো। এসো, আমার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরো।

উত্তাল কীর্তন চলছে। অম্বিকেশের মনে হচ্ছে তার পা দুটো যেন মাটিতে নেই, শূন্যে উড়ে যাচ্ছে। সবাই যেন শূন্যে। মাটি বলে কিছু নেই। আনন্দ হালকা করে জীবন। স্বাভাবিক আনন্দের ঘাটতি হলে তাই কৃত্রিম নেশার ঘোরে হালকা হতে চায় মানুষ। অধীর মন। ভ্রান্ত মন।

কীর্তন হল। সবাই বসল। আরতির আয়োজন শুরু হল। অম্বিকেশ একদম দেওয়াল ঘেঁষে সবার পেছনে বসে। দুটো চোখ বন্ধ করল। গোটা ভারত তার সামনে দাঁড়িয়ে। বলল, ধর্ম কোথায়? শাস্ত্রে? তীর্থে? না রে বোকা। ধর্ম সাধুর চিত্তে ভূমার অনুভবে। সেই অনুভব থেকেই শাস্ত্র, তীর্থ। কিন্তু সাধুহীন শাস্ত্র আর তীর্থ দুই বিফল।

কে ডাকে?

আরতি শুরু হল। নিজের অজান্তেই করতালের ঝঙ্কার জেগে উঠল অম্বিকেশের আঙুলের তালে তালে। বাইরে কুয়াশা কেটেছে। প্রত্যুষের আলো শিশির ধোয়া পদ্মের মত স্নিগ্ধ স্পর্শে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করেছে।

হঠাৎ কী হল। উঠে দাঁড়ালো অম্বিকেশ। তার হাতের ধাতব জিনিস দুটো প্রণাম করে রাখল জানলার পাশে। তাকে যমুনার জল ডাকছে।

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হল যমুনার অনেক কথা বলার আছে তাকে। তারও অনেক অনেক কথা বলার আছে। তার শহুরে জীবনের ঘরবন্দী, কর্তব্যবন্দী জীবনের কথা। তার ফ্ল্যাটের ঝুলবারান্দায় আসা শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা-বসন্তের কথা। দিন রাতের আলো অন্ধকারের কথা। কিছু কথা কাশীর গঙ্গাকে বলে এসেছে। বাকি কথা যমুনাকে বলে যেতে হবে। তারপর ফিরতে হবে। ফিরে আবার আসতে হবে।

রাস্তার পাশে এক চায়ের দোকানে চোখ আটকালো। চায়ের দোকানে চা বানাচ্ছে সেই মন্দিরের বৃদ্ধা। তার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই বলল, চা খাবেন?

অম্বিকেশ অবাক হয়ে বলল, মন্দির থেকে কখন এলেন?

বৃদ্ধা হাসল। বলল, আমি তো বাবা এখানেই। এই তো আমার মন্দির। তোমাদের চা খাওয়াই, এই তো আমার পুজো।

অম্বিকেশের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, আমায় ডাকলে কি তুমি? তোমার নাম কী?

বৃদ্ধা আবার হাসল। বলল, এখানে একজনই ডাকে গো। আমার নাম, যমুনা।