Skip to main content

 

মরা গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বেলা গড়িয়ে যায় অনন্ত মুন্সির। তার বাড়ি থেকে খোঁড়া পায়ে এই গাছটা অবধি হেঁটে আসতে তার সময় লাগে কুড়ি মিনিট মতন। এসে পুকুরের ধারে বাঁধানো বসার জায়গাটায় বসে। বসে থাকতে থাকতে পিঠ ধরে এলে এখানেই শুয়ে পড়ে। দীঘির পাড় ঘেঁষে যে নিমগাছটা, তার শব্দ আসে ঝরঝর ঝরঝর। ঘুম চলে আসে।

এ গাঁয়ে অনন্ত মুন্সিদের ক প্রজন্ম বাস সে নিজেও জানে না। কল্পনা করে তাদের বাড়ির ওই পেছনের মাঠ আগে জঙ্গল ছিল। বাঘ, হরিণ, হাতি বেরোতো। তার পূর্বপুরুষেরা শিকার করত।

মুন্সি ট্রেনে লজেন্স বিক্রি করত। ওই ট্রেন থেকে পড়েই পা গেলো। বউ মরেছে অনেক আগেই। এক ছেলে, সে বিয়ে করে ভিন্ন হয়েছে। শহরে থাকে।

অনন্ত মুন্সি একা। যদিও এই নিয়ে তার কোনো খেদ নেই। তার মনে হয় সে তো সব সময়ই একা। মাকে মনে নেই। বাবা মিস্ত্রির কাজ করত। লেখাপড়া যদ্দিন ঠাকুমা বেঁচেছিল তদ্দিনই। সে বুড়ি চোখ বুজল আর স্কুলে যাওয়ার পাটও চুকল।

বিয়ে করেছে, সংসার করা বলতে যা বোঝায় সেও করেছে। ছেলেকে খাইয়ে, পরিয়ে, যথাসাধ্য বায়না মিটিয়ে বড়ও করেছে। কিন্তু নিজের মধ্যে কাকে পেয়েছে?

অনন্ত শুয়ে বসে সেই কথাই ভাবে। শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে। জানান দিচ্ছে। চলে তো যেতেই হবে। কিন্তু এসেছিল কেন? কার জন্য? এ প্রশ্নের উত্তর পায় না।

অনন্তের চিন্তায় ঈশ্বরতত্ত্ব নেই। সে পরজন্ম মানে না। তার বুদ্ধিতে বলে ঈশ্বর, পরকাল, জ্যোতিষী এসব নিয়ে ভাবা মানে ফক্কাবাজি। বরং সে মানুষকে নিয়ে ভাবে। নিজের মধ্যে ডুবে দেখে আসলে সে কে? খোঁজে না কিছু। খালি দেখে।

অনন্ত দেখে যবে থেকে তার এই পঙ্গুদশা শুরু হল তার উপর লোকের তাচ্ছিল্য বাড়লো। এ কষ্টটাই এখন হয় বেশি। তার নামটাও বদলে “খোঁড়া” হয়েছে কারোর কারোর কাছে।

অনন্ত আজও বসে আছে, মরা গাছটার দিকে তাকিয়ে আছে। ভীষণ গরম, রাস্তায় লোকজন নেই প্রায়। দূরে মনু মোষ চরাচ্ছে মাঠে। একটু পর ওগুলোকে এনে এই পুকুরে নামাবে।

অনন্ত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পুকুরের জলের কাছে এলো। দুদিন খাওয়া নেই। মাথাটা ঘোরাচ্ছে। বমি বমি পাচ্ছে। তার উপর যা গরম। আসলে চাল বাড়ন্ত। চাইলে কেউ দিত না তা নয়, কিন্তু চাইতে ইচ্ছা করছিল না কদিন। দেখতে চায় মানুষ কদিন না খেয়ে বাঁচে।

অনন্ত মাথায় ঘাড়ে জল দিয়ে এসে শুলো। চোখ বন্ধ করেই টের পেল জলে মোষ নামাচ্ছে মনু। হুররর হ্যাট…হুররর হ্যাট……

উঠে বসল অনন্ত। পাশে এসে বসল মনু। বয়েস পঁচিশ ছাব্বিশ হবে। খালি গা, কাঁধে গামছা। খাকি রঙের হাফপ্যান্ট পরে। অনন্তের দিকে তাকিয়ে বলল, কাকা মুখচোখ এরকম বসে আছে কেন গো?

অনন্ত হাসল। বলল, শরীর তো…..যত্ন না পেলেই জানান দেয়। মন দেয় না। নইলে মনের দিকে তাকালে দেখতে সে শুকিয়ে এই গাছটার মত কবে থেকে……

মনু গামছা দিয়ে চোখ মুখ মুছে বলল, তোমার ছেলের কথাটা ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে। একবার এলো না সেই যে গেল।

অনন্ত হাসল। মনু বলল, দাঁড়াও মোষগুলোকে ডলা দিয়ে আসি।

মনু আর মোষ দুই-ই জলে দাপাচ্ছে। দেখতে দেখতে অনন্তর মনটা ভালো হয়ে গেল। দুদিন না খেয়ে থাকা কী আর এমন। কদ্দিন না খেয়ে বেঁচে যায় সে!

অনন্ত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল। গান আসছে মনে। গান ঠিক না, সুর। অনন্তকে পেছন থেকে ডাকছে মনু। ও কাকা…..কাকা……

অনন্ত ফিরে তাকালো।

কাল আমার মেয়েটার মুখেভাত…তুমি সকাল থেকেই চলে যেও…….

অনন্ত এক হাত আকাশের দিকে তুলে বলল, আচ্ছা আচ্ছা রে…….

[4 March 2026]