Skip to main content

 

পরেশের বাড়ির সামনে প্রদীপ যখন এসে দাঁড়ালো, তখন দুপুর তিনটে। এই চৈত্রের দুপুরে কেউ কারোর বাড়ি যায় না। রোদ চড়া। বেশিরভাগ বাড়িতেই এটা ভাতঘুমের সময়। সে প্রদীপও জানে। পরেশ তাদের বাড়ির সামনের রাস্তার পাশের ঝোপগুলো কাটছিল। গতকাল সন্ধ্যায় বাথরুমে যাওয়ার সময় তার বউ, লক্ষ্মী, এখানে চন্দ্রবোড়া দেখেছে।

পরেশ কাস্তেটা ফেলে বলল, দাদা আপনি?

পরেশের মুখে বিস্ময়। প্রদীপের দাঁড়িয়ে থাকায় কিছুটা কুণ্ঠা। পরেশ বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে বলল, ঘরে আসুন দাদা।

প্রদীপ বিনাবাক্যে ঘরে এসে ঢুকল। পরেশ পাখা আলোর সুইচ অন্‌ করে বলল, জানলাটা খুলব না, যা মশা!

প্রদীপ বলল, না না থাক থাক। তুমি ব্যস্ত হোয়ো না। চুমকির বিয়ে সামনের মাসে। তাই….

বলতে বলতে হাতের প্লাস্টিকের প্যাকেট থেকে একটা কার্ড বার করে বলল, তুমি ছেলে আর বউ নিয়ে অবশ্যই এসো পরেশ। আমার খুব ভালো লাগবে।

পরেশের নিজের কানকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাও স্বাভাবিকভাবেই বলল, অবশ্যই দাদা।

প্রদীপ এরপর দু'একটা কথা বলে চলে গেল।

=======

লক্ষ্মী সকালে কাজে যায়, সন্ধ্যায় ফেরে। ছেলে নবীনও তাই। লক্ষ্মী ঠিকে ঝিয়ের কাজ করে, নবীন পেরেকের কারখানায়। পরেশ অনুষ্ঠানবাড়ি রান্নার কাজ করে।

অশান্তি শুরু হল সন্ধ্যেবেলা নবীন আর লক্ষ্মী কাজ থেকে ফেরার পর। নবীনের ঘোরতর আপত্তি এ নেমন্তন্ন রক্ষায়। নবীন এই মাঘে পঁচিশে পড়েছে। পড়াশোনা মাধ্যমিক ফেল অবধি। কিন্তু তার বংশে সে-ই এই পর্যন্ত এসেছে বলে তার মনে একটা গর্ব আছে। পরেশকে সে অশিক্ষিত, তার চাইতে নির্বোধ মনে করে।

বাবা-ছেলের তর্কাতর্কি চলছে। লক্ষ্মী চুপ করে খাটের কোণায় বসে। আগে হলে লক্ষ্মীও এই বিতণ্ডায় অংশ নিত। কিন্তু সে লক্ষ্মী আর নেই। বছর দুই আগে সুন্দরবন অঞ্চলে যে ভীষণ ঝড়টা হল, ওতে তার দাদা আর মা দু'জনেই মরেছে। বৌদি আর বাচ্চাটা বাপের বাড়ি সন্তোষপুরে ছিল, তাই রক্ষে পেয়েছে। এই ধাক্কাটা লক্ষ্মীকে একদম অন্য মানুষ করে দিয়েছে। যেন বাড়ির দুটো পাঁচিল ভেঙে একদিকটা মহাশূন্যের দিকে হাঁ করে দিয়ে গেছে। কিছুতেই কোনো সান্ত্বনা পেল না লক্ষ্মী, নিজের সঙ্গে লড়তে লড়তে এমন একা হল যে নিজেকেই নিজের অচেনা লাগে এখন।

পরেশ বলছে, প্রদীপদারাই আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল, যখন আমরা এ গ্রামে আসি। তুই যা বলছিস তাও ঠিক, আমাকে আর তোর মাকে দিয়ে পশুর মত খাটিয়েছিল।

নবীন বলল, তোমাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দেয়নি, মা মাইনে বাড়াতে বলেছিল বলে?

লক্ষ্মীর মনে পড়ল। রঞ্জনা বৌদির শরীরে দয়ামায়া কম। এক মাসের নবীনকে রেখেও কাজে যেতে হয়েছে। আরো অনেক আছে। কিন্তু এইসবের পারে একটা বড় সত্যি লক্ষ্মীর মন জুড়ে আছে এখন। মানুষ আছে বলেই ঝগড়াঝাঁটি, অশান্তি, ভাব-ভালোবাসা আতিথেয়তা সব আছে। মানুষই যদি না থাকে? আজকাল শুনেছে রঞ্জনা বৌদি আর তার বড় মেয়ে কুসুম দীক্ষা নিয়ে আলাদা রাঁধে, শোয়। কুসুম বিয়ে করবে না নাকি। প্রদীপদা-র দু'বার স্ট্রোক হয়ে গেছে। তাও যত্ন-আত্তি তেমন করে না নাকি। মা-মেয়ে ওই পুজোপাঠ, উপোস টুপোস নিয়েই থাকে।

লক্ষ্মী বলল, তোর বাবাও যাবে না, তুইও না। আমি যাব।

লক্ষ্মীর পরিবর্তনটা নবীনেরও ভালো লাগে না। ভয় করে। লক্ষ্মীর এই আকস্মিক ঘোষণায় বাপ-বেটা তাই লক্ষ্মীর দিকে একবার তাকিয়ে আর নিজেদের দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

=======

একটা বিছানার চাদর কিনে বিয়েবাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতে লক্ষ্মীর বুকটা কেঁপে উঠল। কম অপমান তো এই পরিবার তাকে করেনি। এই বাড়ির আনাচে-কানাচেতে তার কান্না দীর্ঘশ্বাস জমে। পা সরছে না। এমন সময় প্রদীপ বেরিয়েছিল জেনারেটারের ছেলেটাকে ডাকতে। বেরিয়েই লক্ষ্মীর সঙ্গে চোখাচোখি। তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে লক্ষ্মীকে বলল, বাকিরা?

লক্ষ্মী লজ্জা পেল। বলল, মেয়ে কোথায়?

প্রশ্নটা যে শুনেও শুনল না তা বুঝল প্রদীপ। মুখটা একটু ম্লান হতেই আবার পড়ে যাওয়া হাসিটা লুফে নিয়ে বলল, চলো চলো….., এই বলে লক্ষ্মীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে ঢুকল। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতায় এই এক সুবিধা, আবেগের বশে চলতে হয় না, আবেগটাকে অনেকটাই বশে আনা যায়। ভেতরটা শুকিয়ে যায়, কিন্তু লৌকিকতাটা টিকে যায়। ভাগ্যিস সামাজিকতাটা হৃদয় নির্ভর নয়।

লক্ষ্মী উপহারটা দিয়ে, কনের হাতদুটো ধরে, চিবুকে হাত দিয়ে আদর করল। একটু দূরে রঞ্জনা আর বড়মেয়ে বসে। তাকে উপেক্ষা করেই বসে। তাকিয়ে হেসেছিল লক্ষ্মী, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। প্রদীপ লজ্জা পেল। লক্ষ্মীর অভ্যাস ছিল, তাছাড়া এমনই একটা কিছু ঘটবে মনে মনে আশা করেছিল।

প্রদীপ মনে মনে ভাবছিল, তার নিজের ইতিহাস ভালো নয়। নেশা করেছে, টাকা উড়িয়েছে দুই হাতে, স্বেচ্ছাবসর নিয়েছে। নেশামুক্তি কেন্দ্রে থেকেছে। কিন্তু এরা? মা মেয়ে? প্রদীপ ভাবল, সে খেয়াল করেছে ধর্মের এই আচার-বিচারে পা দিলে মানুষ আরো বেশি নিষ্ঠুর হয়ে যায়, অসহিষ্ণু হয়ে যায়। ঘেন্না করাটাকে ধর্মের একটা অঙ্গ হিসাবে দেখে। বড় বড় নাম দেয়, নিরাসক্তি, বৈরাগ্য ইত্যাদি।

=======

লক্ষ্মীকে প্রদীপ নিজে খাবার জায়গায় বসিয়ে গেল। প্রদীপের এই পরিবর্তন কেন লক্ষ্মী বুঝে পেল না। সংসারে কতটা একা হলে মানুষের এই বোধ আসে? মৃত্যুই তো মানুষকে একা করে না, উপেক্ষাও তো আছে।

সামান্য কিছু খেয়ে, একরকম কাউকে না বলেই বিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো লক্ষ্মী। একজন পরিচিত মানুষকে বলে এলো প্রদীপদাকে জানিয়ে দেওয়ার জন্য।

রাস্তা অন্ধকার। ফিরছে। হঠাৎ কেউ ডাকল, লক্ষ্মী!

পেছনে তাকিয়ে দেখে প্রদীপদা। হাতে মদের বোতল। পাঞ্জাবির বোতাম খোলা। হঠাৎ রাস্তায় বসে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল প্রদীপ। বলল, কী অত্যাচার করেছি আমরা কর্তাগিন্নি মিলে রে তোর উপর। তাও তুই আজ এলি। আমার লিভারে ক্যান্সার। বাঁচব না। তোদের অভিশাপেই হয়েছে। কিন্তু তুই আমার পরিবারের ওদের ক্ষমা কর বোন, নইলে আমার মেয়েটা বিয়ে হয়েও শান্তি পাবে না।

লক্ষ্মী কাঠ হয়ে আছে লজ্জায়। ভাগ্যে এইদিকটায় কেউ আসে না এখন।

লক্ষ্মী বলল, আমি অভিশাপ দিইনি দাদা কাউকে। তবে মরবে কেন? ভালো ডাক্তার দেখাও। আর ওগুলোই বা খাচ্ছ কেন?

প্রদীপ উঠে দাঁড়ালো। বলল, আসি রে। মরলে একবার দেখতে আসিস। আসবি তো?

লক্ষ্মীর প্রাণটা চমকে উঠল। বলল, বাড়ি যাও দাদা। ফিরি, গিয়ে রান্না না চাপালে ওদের খাওয়া জুটবে না।

প্রদীপ বলল, যা। আমার শুধু টাকাই আছে লক্ষ্মী আজ….. কিচ্ছু নেই।

প্রদীপ ফিরে গেল। লক্ষ্মী বাড়ি ফিরে দেখল নবীনের ঘরের আলো নেভানো। বারান্দায় পরেশ শুয়ে।

পরেশ বলল, ওর মাথা ধরেছে বলে শুলো। আমিও আর খাব না। তুমি ছাড়ো এ বাইরের শাড়ি। আমি একটু হেঁটে আসি।

ঝাঁঝিয়ে উঠল লক্ষ্মী। বলল, আমি বেঁচে থাকতে এসব অনাসৃষ্টি এবাড়িতে হবে না। ভাত ডাল চাপাচ্ছি, গিলে শোবে বাপ-ছেলে।

পরেশ বারান্দায় বসে পড়ল। নবীন ঘুমায়নি। মায়ের কথা শুনে বাইরে বেরিয়ে এসে বলল, তোমায় কিছু বলেছে ওরা?

লক্ষ্মী চাল ধুতে ধুতে একবার আড়চোখে তাকিয়ে বলল, বললে কী করতে?

নবীন কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল। লক্ষ্মী বলল, মানুষকে বুঝতে গেলে যতটা দুঃখ পেতে হয় তার কিছুই পাওনি এখনো….. ঘরের আলোটা জ্বেলে বসো… ভাত হলে ডাকছি…..