রেলের কলোনি এখন পরিত্যক্ত আবাসভূমি। ভাঙা ভাঙা বাড়ি। রাস্তায় ঝোপজঙ্গল। বড় বড় গাছগুলো শুকনো পাতা বিছিয়ে আকাশ ঢেকে দাঁড়িয়ে। সেদিন সেই রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে একটা বাড়ির সামনে দাঁড়ালাম। এককালে এই বাড়িতে আমি ছিলাম। মা, ভাই আমি আর বাবা। বাড়িটা দোতলা। উপরের তলার বারান্দাটার সামনের গ্রিলটা ভেঙে হাঁ হয়ে আছে। ভেতরটা অন্ধকার। বাড়িটার ছাদের উপর গাছ উঠেছে। দেখে মনে হল অশ্বত্থ গাছ। সামনে হাঁটার রাস্তাটা নেই প্রায়। ঝোপেঝাড়ে ঢেকেছে। আমার কত সুখস্মৃতি এই বাড়িটার বুকের মধ্যে। তার এমন জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে মনটা ব্যথায় কুঁকড়ে গেল।
মানুষ সান্ত্বনা ছাড়া বাঁচে না। ঈশ্বর সত্য কিনা যে তর্ক করে, তার জীবনে সান্ত্বনার একান্ত তৃষ্ণা জাগেনি বলেই করে। ঈশ্বরের অস্তিত্ব যুক্তির কাছে যতই দুর্বোধ্য হোক, কিন্তু ব্যথিত হৃদয়ের কাছে তা নয়। সেটা তর্কের জায়গা নয়। লড়াইয়ের জায়গা নয়। ঈশ্বর যেখানে সান্ত্বনার সামগ্রী নন, সেখানেই তিনি তর্কের আর প্রতিস্পর্ধার বিষয়। যেমন উচ্চাঙ্গসংগীতে সুর যেখানে আনন্দের বিষয় হয় না সেখানে সে তাল, লয়, ঘরানা, বাদী সমবাদী ইত্যাদি নিয়ে তর্কের আখড়া হয়। রসিক পালায়, পণ্ডিত কোমর বাঁধে। মানুষের সৃষ্টি ভাষা, পোশাক, সঙ্গীত, সাহিত্য ইত্যাদি সব জিনিসের যেমন বৈচিত্র্য আছে, ধর্মেরও আছে। কিন্তু সেখানে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা নেই। ধর্মে বৈচিত্র্যর অস্তিত্ব একে অন্যের কাছে থ্রেটের সমতুল্য কেন? কারণ এখানে যুক্তির জোর নেই, গায়ের জোর আছে। তাই ব্রহ্মে, আল্লায়, খ্রীষ্টে কোন্দল আর থামে না। কিন্তু যখন সে সান্ত্বনার বাণী নিয়ে আসে তখন আর কোন্দলের কথা মনে ওঠে না। কিন্তু সান্ত্বনা খুঁজবে এমন শোক, এমন আঘাত মানুষ কদ্দিন মনে রাখে?
আমি জরাজীর্ণ স্মৃতির আলেখ্যর সামনে দাঁড়িয়ে আমার দৃষ্টির বাইরে চলে যাওয়া আমার ভাই আর মায়ের কথা ভাবছিলাম। চোখে জল আসার আগেই মনকে সতর্ক করে বললাম, রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদার মত শোক এ নয়। একটা অতিমারী, কয়েকটা নারকীয় যুদ্ধ যে ছবিগুলোর সামনে দাঁড় করিয়েছে আর করাচ্ছে তার সান্ত্বনা কোথায়? কোন ঈশ্বরের কাছে শিশুর কবরের সান্ত্বনা আছে?
নেই। একটা শীতল উদাসীনতা ছাড়া কিচ্ছু নেই। শোকের জন্য মানুষের উপর শ্রদ্ধা লাগে। কিন্তু নিরীহ প্রাণের হত্যাকারীর উপর শ্রদ্ধা রাখতে পারি মাথাটা এখনো অতটা নির্বোধ হয়নি।
যে সত্য বলে তার উপর চিত্তের শ্রদ্ধা জন্মায়। যে যত গভীরের সত্যকে প্রকাশ করে তার উপর তত গভীর শ্রদ্ধা জন্মায়। মানুষের গভীরতম সত্য জড়পদার্থর রহস্য আবিস্কার করে নয়, নিজের অস্তিত্বের গভীরতাকে স্পর্শ করে। সেখানেই তার মুক্তি, আনন্দ, সার্থকতা। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু মৃত্যুর চাইতেও বড় জিনিস মানুষ যা আবিষ্কার করেছে সে আত্মা নয়, সে মনুষ্যত্ব। সে তাই মৃত্যুকেও বরণ করেছে বহুবার, কিন্তু মনুষ্যত্বকে ক্ষুণ্ণ হতে দেয়নি। যেখানে দিয়েছে সেখানে সে নিজের গ্লানিতে নিজেই মরেছে। মৃত্যুর অধিক সে মরণ।
মনুষ্যত্ব কী? এর কোনো বাচিক সংজ্ঞা হয় না। যেমন গভীর রাতে বেহালায় জাগা দরবারি কানাড়ার কোনো মানচিত্র হয় না। মনুষ্যত্ব অমর, অজেয় সত্য। বলা যায় বাকি সব মানবিক সত্য এই সত্যকেই আশ্রয় করে দাঁড়িয়ে। যদি বলি একে আমি রাখব, তবে তা নির্বোধ অহংকারীর প্রলাপ হয়। জ্যামিতির নিয়ম নিজে বানিয়ে গৃহনির্মাণ যেমন উন্মাদের কল্পনা, এও তেমন। জ্যামিতিকে আবিষ্কার করা যায়, তার নিয়মকে সম্মান জানিয়ে নানা কিছু রচনা করা যায়, কিন্তু তাকে উপেক্ষা করলে নিজের ধ্বংসের বীজ নিজের হাতেই বপন করি। এও তেমন।
যে যুগে এসে দাঁড়িয়েছি, সে গায়ের জোরের যুগ। এখন প্রতিবাদ করার চাইতে স্থির হয়ে অপেক্ষা করার মূল্য অনেক বেশি। গায়ের জোরের প্রতিবাদ যুক্তি দিয়ে হয় না। গায়ের জোর আরো বেশি দেখালে সমাধান কিছু হয় না, ধুলো ওড়ে আর রক্তারক্তি হয়। কিন্তু এই সময় ধৈর্যর মূল্য অসীম। আজ অবধি কোনো যুদ্ধ কোনো কিছুর মীমাংসা করেনি। কিন্তু তবু যুদ্ধের উপর, গায়ের জোর দেখানোর মোহ মানুষ ছাড়তে পারে না। সব মোহের মত এ মোহও ভেঙে যাবে। সেদিন কী অবশিষ্ট থাকবে জানি না, কিন্তু যতটুকু থাকবে খাঁটি জিনিসই থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। ওইতেই আবার শুরু করা যাবে। আপাতত এ গ্রহণ ছাড়ার অপেক্ষা।