পকেটের উপর দিয়ে হাতটা বাড়িয়েই বুঝল সিগারেটের প্যাকেটটা বাড়িতে ফেলে এসেছে। লোকাল ব্র্যাণ্ড নয় যে সামনে যে কোনো দোকান থেকে কিনে নেব, এইসব মাথার মধ্যে ঘুরতে ঘুরতেই খেয়াল করল নাকে লাগছে একটা মিষ্টি গন্ধ। সানগ্লাসটা চোখ থেকে নামিয়ে তাকালো সামনের দিকে। সার দিয়ে আমবাগান। এটা দিল্লি রোড। ফেব্রুয়ারির লাস্ট উইক। ভালোই গরম পড়তে শুরু করেছে। রোদটা চড়া। সুপ্রিয় গাড়িতে হেলান দিয়ে আমবাগানের দিকে তাকিয়ে থাকল।
সুপ্রিয়'র মিটিংটা ক্যান্সেল হয়েছে, যেটা ও জাস্ট খানিক আগেই জানতে পেরেছে। ভাবলো অফিসে ফিরবে। কিন্তু ইচ্ছা করল না। মনটা ক'দিন হল তার ইচ্ছার সঙ্গে বিট্রে করছে। কী হচ্ছে সেটা বোঝার জন্য যতটা সময় দরকার নিজেকে দেওয়ার, দিচ্ছে না।
======
সুপ্রিয়'র বয়েস পঁয়ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। চেহারা সুঠাম। চওড়া কাঁধ। লম্বাটে মুখ। ক্লিন শেভ্ড। গায়ের রঙ ফর্সা। মায়ের রঙ পেয়েছে। বাবা যথেষ্ট কালো ছিলেন। কেউ নেই এখন। বউ, বিতস্তা, সমবয়সী। কলেজে পড়তে সম্পর্ক তৈরি হয়। কলেজে পড়ায়। সুপ্রিয় একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টে আছে।
এরকম একা রাস্তায় এসে কবে দাঁড়িয়েছে?
গাড়িটা রাস্তার আরো ধারে পার্ক করে আমবাগানে এসে ঢুকল। সাদা শার্টের উপরের তিনটে বোতাম খুলল। দামী ব্র্যাণ্ডের শার্ট। বিতস্তা দিয়েছে বিবাহবার্ষিকীতে।
একজন মহিলা শুকনো কাঠ কুড়াচ্ছিল। সুপ্রিয়'র দিকে তাকালো। সুপ্রিয় আই কন্ট্যাক্ট এড়িয়ে গেল। মনের মধ্যে ধূসরতা বাড়ছে।
একটা সময় মনে হত সেক্স অ্যাপিল, ইন্টেলিজেন্স আর অ্যাম্বিশান জীবনের মূল চালিকাশক্তি। তার সেগুলো আছে বলেও বিশ্বাস করত। কিন্তু…
কোকিল ডাকছে।
======
সুপ্রিয় একটা নীচু হয়ে আসা আমগাছের ডালে বসে। মোবাইলটা সাইলেন্ট করেছে একটু আগে।
মনের ডার্ক সাইড নিয়ে যতটা নাড়াচাড়া করেছে ততটা ফেলিওরের দিকগুলো নিয়ে নয়। ডার্ক সাইডের যেন একটা জাস্টিফিকেশান আছে। একটা ইভোলিউশনারি হাইপোথিসিস আছে। কিন্তু ফেলিওরগুলোর? ভাগ্য? বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না। অল্প বয়সে মনে হত সব নিজের হাতে। এখন মানতে না চাইলেও মনে হয় পার্শিয়ালি ভাগ্যের হাতে তো বটেই। না হলে এখন তো এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা না, এখন তো বর্ধমানের লাক্সারি হোটেলের কনফারেন্স রুমে প্রেজেন্টেশন দেওয়ার কথা।
“কাউকে খুঁজছেন?”
======
ইদানীং মানুষ ভালো লাগে না। নিজের মধ্যে একটা সাইলেন্ট জোন তৈরি করে ফেলেছে। আর একটা জোন আছে, ডোন্ট লুক অ্যাট, যেটা পেরিয়েই সাইলেন্ট জোনে ঢুকতে হয়।
নাহ্, এমনি।
“এ বাগান কিনবেন? কিন্তু মালিকরা তো নাই। চিকিচ্ছার জন্য ভেলুর গেসেন।"
না না, আরে না, ওসব না।
“আমের বায়না দিবেন? কয় পেটি? আমি খবর দিইই?”
আরে না না, প্লিজ। আপনি আসুন। আমি এই বিশ্রাম নিচ্ছি একটু।
চোখে অবিশ্বাস নিয়ে ফিরে গেল লোকটা। বেশ বয়েস হয়েছে। খালি গা। খালি পা। লুঙ্গিটা দুই হাতে হাঁটুর উপর দিয়ে গোটাতে গোটাতে চলে যাচ্ছে।
======
বিতস্তা বাচ্চা চায় না। সুপ্রিয়'র আগের মন চাইত। ধূসর মন কী চায় সে বোঝে না। আদৌ কিছু চায় কি? নাকি বাকি সব চাওয়া মরতে মরতে এই ব্ল্যাকহোলের জন্ম হয়। মনের ব্ল্যাকহোলের রঙ কি ধূসর?
======
সুপ্রিয়'র কিছু মুখ মনে পড়ল। শান্ত, নিরীহ। কেউ তার বন্ধু ছিল। বেশিরভাগই বন্ধু ছিল না। তাদের অনেকেই ফেলিওর আজ। কিন্তু কোনটা আসল ফেলিওর? যা নিজের বোধে বোধ হয়, নাকি যা সমাজ ইঙ্গিত করে? অরূপ, নির্ঝর, সুকান্ত, বৈভব, প্রবীর, অপূর্ব…. এরাও তো বেঁচে আছে। সম্পদ, শরীর, মান ইত্যাদির গৌরবহীন। আছে তো বেঁচে। তার সামনে দাঁড়ালে সঙ্কুচিত হয় ওরা। এতদিন মনে হত নিজেদের ইনফেরিওরিটির জন্য ওরা এরকম বিহেভ করে। এখন মনে হয় ওদের অস্বস্তির কারণ ওদের কমপ্লেক্সিটি নয়, সে নিজে। কী ভীষণ কমপ্লেক্স সে। কিন্তু এটাই তো সে। সত্যিকারের কি তাই?
আজ যদি না ফেরে? নয়ডায় শিফট হওয়ার কথা আগামী বছর। তারপর সেখানে কয়েক বছর কাটিয়ে অস্ট্রেলিয়া।
কিন্তু নিজেকে ভোলাচ্ছে, না নিজেকে নিয়ে অন্তহীন প্রতিযোগিতায় লেগেছে। মিডলক্লাসের তকমা ছাড়াতেই হবে। আগে ভীষণ মনে হত। এখন গোটা পৃথিবীটাই ক্লাউনদের লাগে। সেকি একটা বড় ক্লাউন হতে চাইছে নিজেও?
======
ফোনটা অন্ করল। চারটে মিসড কল। দুটো বিতস্তার। একটা অফিসের। একটা….
======
মেসেজ নোটিফিকেশন আছে। অন্ করল। “মিসড পিরিওডস দিস মান্থ। ইন প্যানিক অ্যাটাক। নিড টু টক মিসেস লাহিড়ী। ফিক্সড ডেট”।
======
কোকিল ডাকল আবার। ডেকেই যাচ্ছে। বিকেল হচ্ছে। কয়েকটা বাচ্চা দূর থেকে তাকে দেখছে। খেলছে ওরা। ওদের পায়ে বল। নিজের পার্ফিউমের গন্ধটা বিরক্তিকর লাগল। বাচ্চাগুলোর দিকে এগোলো। ধূসর মন ভুরু কুঁচকে। পায়ের পেশীতে বুকের থেকে নেমে আসা গতজন্মের ধাক্কা। ওরা বল হাতে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে। হাঁ করে।
সুপ্রিয় জামার হাতাটা গুটাতে গুটাতে বলল, খেলব।