Skip to main content

 

সমাজে তার সহজ পরিচয় সে ট্রাক ড্রাইভার। বয়েস পঞ্চাশ ছুঁতে চলল। কুড়ি একুশ বয়েস থেকেই সে রাস্তায়। বিয়ে হয়নি। অনেকবার মনে হলেও হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এমন মানুষ তার জীবনে এসেছে যাকে কাছ ছাড়া করলে জীবন নিরর্থক মনে হয়। সে জব্বলপুরের কাছে এক ছোটো শহরের ধাবায় কাজ করা বিধবা মহিলা, বয়েস তিরিশের কাছাকাছি।

তাদের পরিচয় করোনার পরে পরেই। পরিচয় হওয়ার পর ড্রাইভারের মনে হয়েছিল ঈশ্বর যেন কবেই এক মুখ বন্ধ করা চিঠি পাঠিয়েছি রেখেছিলেন তার ঘরে, আর সে চিঠি এমন আবর্জনার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল যে খুঁজে পেতে এত দেরি হল। এত চেনা কোনো অচেনা মানুষ হয়? এমনই চেনা সে যে তাকে ছাড়া নিজেকেও পর লাগে?

তারা ঘুরতে গেছে একসঙ্গে। শরীরে মনে মিলতে কোথাও বাধেনি এক মুহুর্তের জন্য। বরং নিজের শরীর মন যেন এতদিন অর্ধেক হয়ে বাঁচছিল, এমনই মনে হয়েছে তার স্পর্শ পেয়ে। আদর পেয়ে।

ট্রাক ড্রাইভার তার ট্রাকের নাম দিয়েছে আমিনা। তার নামের সঙ্গে যোগ রেখে। সেদিন সে এসেছে কাঁচরাপাড়ায়। মাল নিয়ে এসেছে আমেদাবাদ থেকে। কাগজপত্রের কাজগুলো হয়ে গেলেই সে তার এই আমিনাকে নিয়ে ছুটবে জব্বলপুরের দিকে। প্রায় ছ মাস পর বসবে তার ঘরে। জানলা খুলে অপেক্ষা করবে কখন সে ফেরে ধাবা থেকে। সে এসে স্নান সেরে তার পাশে বসবে। তার মাথাটা টেনে তার বুকের সঙ্গে মেশাবে। সে বাঁচবে আবার গোটাগুটি!

মালিকের মেয়ের বিয়ে। তাই কাগজপত্র ছাড়তে দেরি হচ্ছে। মালিকের আদরযত্নের ত্রুটি নেই। কিন্তু তার মন একবেলা থেকে আরেকবেলা গড়ালেই বলছে, আর না…আর না।

এক সন্ধ্যেবেলা সে বসে আছে তার ট্রাকের সিটে। লতার গান চলছে অল্প আওয়াজে। বিকেলে একচোট কালবৈশাখী ঝড় হয়ে গেছে। বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে। এদিকটা ফাঁকা। পাশ দিয়ে ট্রেন লাইন গেছে। সে চোখটা বন্ধ করে গান শুনছিল, এমন সময় তার ট্রাকের সামনে কিছু পড়ার শব্দ পেল।

দরজা খুলে নীচে নেমে দেখে রাস্তায় একটা গাছের ডাল ভেঙে পড়ে, সে ডালে লাল কমলা হলুদ রঙ মেশানো কী দারুণ বড় বড় ফুল।

ডাল থেকে ফুলগুলো ছিঁড়ে ট্রাকের দিকে তাকালো। স্ট্রিট লাইটের সাদা আলোয় সদ্য বৃষ্টিতে ধোয়া ট্রাক যেন আমিনার সদ্যস্নাত রূপ। গাড়িতে উঠল। দরজার পাশে যে বড় আয়না, সে আয়নার হাতলে একটা একটা করে ফুলগুলো সাজালো। সাজাতে সাজাতে চোখ ভরে এলো জলে। কী দিয়েছে, কী পেয়েছে, কী ভবিষ্যৎ…. এ সব প্রশ্ন কী অর্থহীন। দুজনের এই দুজনের হয়ে থাকাটার চাইতে বড় সত্যি আর কী আছে।

ট্রাকটা থেকে নেমে স্ট্রিট লাইটের আলোর বাইরে এলো। অন্ধকারে উবু হয়ে বসল মাটিতে। আকাশে তখন মেঘ ছেঁড়া একফালি চাঁদ। আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে আমিনা। তার হাতের সাজে সেজে।

ফোন বাজল। মালিকের বাড়ি থেকে ফোন। খেতে ডাকছে।

গেলো না। বলল, শরীর ভালো না। রাত এগারোটার পর ফোন ধরবে আমিনা। আজ বিশেষ দিন। একই ভালোবাসা, এক একদিন এক একটা নতুন জাতের ফুলে সাজে। আজ সে কথা বলবে আমিনাকে। আজ মালিকের নেমন্তন্নে গেলে হয়?