Skip to main content

 

মানুষ অন্যের সত্যে বাঁচতে পারে না। অন্যের মতে বাঁচতে পারে। সত্য ক্ষণস্থায়ী। এক ঝলক প্রকাশিত হয়েই আবার পুনরাবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু মত দীর্ঘস্থায়ী। মত দীর্ঘদিন বাঁচতে বাঁচতে প্রাণশক্তি হারায়। শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে, দুর্বল, ভীরু প্রাণের রস শোষণ করে আরো দীর্ঘ জীবন আকাঙ্খা করে। সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না তার ভেতরের সত্য প্রাণ ভ্রমরা দীর্ঘদিন মৃত।

কিন্তু সংসারে ক্ষণস্থায়িত্বের দাম কম। যা টেকসই, দীর্ঘস্থায়ী তার আসন সর্বাগ্রে। তার আদরও অনেক বেশি। তাই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষদের তাৎক্ষণিক সত্য অনুভব মূল্যহীন হয়ে যায়, কিন্তু তার অনুকরণে জন্মানো মতের রশি পাকিয়ে অনুগামীদের দল তৈরি হয়। সত্য আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকে। মত বলে এই যে আমি এত স্পষ্ট হয়ে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে, আমিই আছি চিরকাল, আমাকে পুজো করো, আমাকে আঁকড়ে ধরো। সত্য কী? ওসব অলীকের পেছনে কেন দৌড়াচ্ছ?

তার্কিক বলবে, তবে গুরু শিষ্যকে কী দেন? মত, না সত্য?

উত্তরে বলব, কোনোটাই না। যা দেন তা হল, জীবন। গুরু যতদিন জীবিত ততদিন তার মধ্যে ভাঙাগড়া চলে। প্রতিদিন সে অসহ্য, অব্যক্ত যন্ত্রণা তার আশেপাশের বেষ্টনীর মানুষেরা প্রত্যক্ষ করেন। তারা এটুকু বিশ্বাস করেন, এ মানুষটা আর যা করুন তাদের সঙ্গে প্রতারণা করবেন না। গুরুর যন্ত্রণার সাক্ষী থাকাই শিষ্যের অন্তরকে শুদ্ধ করে। সে বুঝতে পারে ফাঁকি দিয়ে সত্যকে পাওয়ার জো নেই। নিজে পুড়ে, নিজে নিঃশেষ হয়ে গিয়ে সে রাস্তায় হাঁটা লাগে।

সেই অলোকসামান্য মহাত্মারা যখন চলে যান তখন থেকেই ধীরে ধীরে সত্যের জ্যোতি কমতে শুরু করে। মত ও প্রতিষ্ঠান সে জায়গা নিয়ে বাঁচতে চায়। কী হয়? যা হওয়ার তাই হয়। সত্যের অনুষঙ্গে যে প্রেম, ঔদার্য, সহনশীলতা প্রাণের শক্তিতে আলোকিত হয়ে থাকে, তা ম্লান হয়ে গিয়ে শুধুই অভিনয়টুকু পড়ে থাকে। ত্যাগের অভিনয়, বাণীর অভিনয়, প্রেমের অভিনয় ইত্যাদি। অভিনয় কখনও সর্বাঙ্গীণ হয় না বলেই তা আচরণ নয়, উপলব্ধি নয়। কেবল অভিনয়। অভিনেতাও আমাদের অভিনয়ে ভোলাতে চান, আর আমরাও ভুলতে চাই বলে সব অসঙ্গতি, মিথ্যার দিকে উদাসীন থেকে বলি, সব ঠিক আছে। সে যে কী ভীষণ মিথ্যা সে আমি জানি বলেই এ ভুল ভাঙাতে কেউ এলে তার উপর চড়াও হই আক্রমণে।

কিন্তু এ তো অর্ধসত্য। প্রতিটা মানুষকেই ঘাতে প্রতিঘাতে একদিন নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হয়। নিজের সত্যকে নিজের মধ্যে দেখতেই হয়। তখন বাইরের মত বাইরেই পড়ে থাকে। সে নিজের অন্তরের আলোতে জাগা সত্যের দিকে তাকিয়ে কেঁদে বলে, তুমি এত সত্য আগে তো জানতাম না! আমি বিশ্বাস করেছিলাম আজীবন নানা মতের খেলনা দিয়ে নিজেকে ভুলিয়ে রাখা ছাড়া যেন আমার ভাগ্যে আর কিছুই নেই। কিন্তু এই তুমি সামনে আমার!! এত স্পষ্ট! আমার চেও সত্য! কেন তুমি আগে এলে না?

সত্য বলে আমাকে একান্তভাবে চাওনি সেদিন তাই…..